কয়েক বছর আগের তীব্র অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক রূপে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। একটা সময় জ্বালানির জন্য কিলোমিটারের পর কিলোমিটার লাইন, বাজারে নিত্যপণ্যের সংকট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতা, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি আর ক্ষুব্ধ মানুষের দখলে চলে যাওয়া প্রেসিডেন্ট ভবনের ছবি ছিল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই দেশই আজ যেন নতুন এক গল্প লিখছে। সেই গল্প কেবল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর নয়, বরং শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা, পর্যটন আর মানুষের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ারও।

এ পরিবর্তনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ২৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের শ্রীলঙ্কা সফরে। মনে ছিল একটাই প্রশ্ন। ২০২২ সালের ভয়াবহ সংকটের পর দেশটি আদতে কতটা বদলেছে? উত্তর মিলতে শুরু করে দেশটির রাজধানী কলম্বোতেই।

2

বিকালের নরম আলোয় রাজধানী শহরটিকে দেখে প্রথমেই মনে হয়, এ যেন দক্ষিণ এশিয়ার অন্য রকম এক নগরী। ভারত মহাসাগরের দিক থেকে ভেসে আসা বাতাসে লবণের গন্ধ। পরিচ্ছন্ন রাস্তার দুই পাশে সারি সারি নারিকেলগাছ। যানবাহন চলছে, কিন্তু অকারণ হর্ন নেই। ব্যস্ত শহর, অথচ বিশৃঙ্খলা নেই। কয়েক বছর আগের সেই অস্থির রাজধানীর সঙ্গে এ কলম্বোর মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন।

২০২২ সালে এ শহরের রাস্তায় রাস্তায় ক্ষোভে ফুঁসছিল মানুষ। জ্বালানি ও খাদ্যসংকটে অতিষ্ঠ জনতা প্রেসিডেন্ট ভবনে ঢুকে পড়েছিল। কেউ সুইমিংপুলে নেমেছিল, কেউ রান্নাঘরে খাবার খেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসেকে। সেই স্মৃতি এখনো টাটকা। কিন্তু বর্তমান কলম্বো যেন অতীতকে পেছনে ফেলেই সামনে এগোতে শিখেছে।

রাজধানী ছেড়ে পাহাড়ের পথে যাত্রা শুরু হতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়ক, চারপাশে সবুজের বিস্তার আর নিখুঁত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চোখে পড়ে বারবার। সবচেয়ে বিস্ময় জাগায় পথচারীদের প্রতি চালকদের আচরণ। রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়াতেই একের পর এক গাড়ি নিজে থেকেই থেমে যায়। কোনো ট্রাফিক পুলিশ নেই, কোনো হর্ন নেই। মনে হয়, শৃঙ্খলা এখানে কেবল আইন নয়, মানুষের অভ্যাস।

পাহাড়ের বুক চিরে পৌঁছে যাই নুয়ারা এলিয়ায়। বিস্তীর্ণ চা-বাগান, কুয়াশায় ঢাকা সবুজ ঢাল আর শীতল বাতাস মুহূর্তেই অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। দূরে পাহাড়ের গায়ে মেঘের ছায়া, নিচে সারি সারি চা-গাছের ফাঁকে শ্রমিকদের নীরব ব্যস্ততা। সব মিলিয়ে যেন জীবন্ত এক জলরঙের ছবি।

4

এরপর গন্তব্য এলা। পাহাড়ি এ জনপদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নাইন আর্চেস সেতু। শত বছরের পুরনো এ সেতুর ওপর দিয়ে যখন ধীরে ধীরে ট্রেন এগিয়ে যায়, তখন চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যটকদের চোখে একই বিস্ময়। সবুজ পাহাড়ের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপনাটি যেন প্রকৃতি আর ইতিহাসের এক অপূর্ব মিলন।

এলার কাছেই রাবণ জলপ্রপাত। পাহাড় বেয়ে নেমে আসা সাদা জলধারা, চারপাশের ঘন বন আর পানির গর্জন মিলিয়ে প্রকৃতি এখানে নিজেই যেন নিজের সৌন্দর্যের গল্প বলে।

ভ্রমণের পরের গন্তব্য দক্ষিণের ঐতিহাসিক শহর গল। ভারত মহাসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এ শহরের প্রাণ হলো গল দুর্গ। পর্তুগিজদের নির্মাণ, পরে ডাচদের সম্প্রসারণ— শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এটি। আজ এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। দুর্গের সরু রাস্তা, পুরোনো ইউরোপীয় ধাঁচের ভবন, সমুদ্রঘেরা দেয়াল আর বাতিঘর যেন সময়কে কয়েকশ বছর পেছনে ফিরিয়ে নেয়। সূর্য ডোবার সময় দুর্গের দেয়ালে বসে ভারত মহাসাগরের ঢেউ দেখা পুরো সফরের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে।

3

শেষে যাওয়া হয় মিরিসা সমুদ্রসৈকতে। নীল জলরাশি, শান্ত ঢেউ আর নিরিবিলি পরিবেশ সৈকতটিকে দিয়েছে ভিন্ন আবেদন। সন্ধ্যার আকাশে কমলা আর বেগুনি রঙের মিশেলে সমুদ্রের বুক থেকে ধীরে ধীরে ফিরে আসে জেলেদের নৌকা। সেই দৃশ্য যেন সব ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে যায়।

পুরো সফরে একটি বিষয় বারবার মনে হয়েছে, একটি দেশ শুধু অর্থনীতির হিসাব দিয়ে বদলায় না। বদলায় মানুষের মানসিকতা, নাগরিক দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও সুশাসনের মাধ্যমে। আর শ্রীলঙ্কা হচ্ছে সেই পরিবর্তনেরই উদাহরণ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তায় অর্থনৈতিক সংস্কার, পর্যটন খাতকে নতুন করে দাঁড় করানোর উদ্যোগ এবং মানুষের অংশগ্রহণসহ সব মিলিয়ে দেশটি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর পথে। যদিও যাত্রা এখনো শেষ হয়নি, কিন্তু পথচলা শুরু হয়েছে দৃঢ়ভাবে।

5

বাংলাদেশের জন্যও এ অভিজ্ঞতায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বিশেষ করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্ন নগর সংস্কৃতি, পর্যটন খাতের উন্নয়ন ও সুশাসনের মতো জায়গাগুলো আমাদের নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়। সঠিক পরিকল্পনা, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব আর নাগরিক সচেতনতা থাকলে যেকোনো গভীর সংকট থেকে একটি দেশ যে আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারে, শ্রীলঙ্কা এখন তারই জীবন্ত উদাহরণ।

লেখক: বণিক বার্তা প্রতিনিধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়