রাজশাহীর মোহনপুরের আমগাছী গ্রামের একটি পরিবার। চার সদস্যের এ পরিবারের কর্তা (কারাবিধি অনুসরণ করে বন্দির পরিচয় প্রকাশ করা হলো না) থাকেন জেলখানায়। হত্যা মামলার সাজা খাটছেন তিনি। পাশাপাশি কারা অভ্যন্তরে পোশাক শিল্পে কাজ করে ভালো আয়ও করছেন। কারাগারে থেকেই গড়ে প্রতি মাসে তার আয় ৮ হাজার টাকার কিছু বেশি। অথচ কারাজীবনের আগে তিনি স্থানীয় একটি কারখানায় কাজ করে মাসে আয় করতেন ৬ হাজার টাকা। কারাজীবনে আয়ের টাকায় সংসার চালিয়ে দুই সন্তানের স্কুলের খরচও জোগাচ্ছেন তিনি। শুধু মোহনপুরের এক পরিবারের এ কর্তা নয়, ৫০ হাজারের বেশি কারাবন্দি কারা অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা ১৩ ধরনের শিল্পে কাজ করছেন। তাদের অনেকেই কারাবরণের আগে যা আয় করতেন, এখন তার চেয়ে বেশি আয় করছেন। লভ্যাংশ হিসেবে বন্দিরা এরই মধ্যে পেয়েছেন ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। কর্মক্ষম বন্দিদের শ্রমমুখী করে তোলার মধ্য দিয়ে তাদের অপরাধপ্রবণতা রোধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

দেশের কারাগারগুলোকে শিল্পমুখী করে তুলতে ২০১৩ সাল থেকে বন্দিদের বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু করে কারা অধিদপ্তর। প্রথমে তাদের পোশাক শিল্প, হস্তশিল্প, তাঁত শিল্প, বাঁধাই শিল্পে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পাশাপাশি আসবাব তৈরি ও বৈদ্যুতিক সামগ্রী মেরামতের মতো কাজে আগ্রহ লক্ষ করা যায় কারাবন্দিদের। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে দেশের ৩০টি কারাগারে ১৩ ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। তিন হাজার কারাবন্দিকে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে কারাগারগুলোয় বিভিন্ন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন কর্মমুখী বন্দির সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। এসব বন্দির উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে সিল্কের শাড়ি, কাতান, বন্দিদের পোশাক, বেডশিট, প্রিন্টের থান কাপড়, গামছা, লুঙ্গি, নকশিকাঁথা, কাঠ ও বাঁশের আসবাবসহ নানা ধরনের সামগ্রী। এসব শিল্পের পাশাপাশি কাশিমপুর-২ কারাগারে রয়েছে একটি ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রেস। সেখানে বিভিন্ন প্রকাশনীর কাজ করেন বন্দিরা। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ কারাগারে রয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৩ সাল থেকে দেশের কারাগারগুলোয় শিল্পমুখী কার্যক্রমে বন্দিরা যুক্ত হন। কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে বন্দিরা নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের লভ্যাংশের ৫০ শতাংশ পেতে শুরু করেন। সেই হিসেবে ওই অর্থবছরে দেশের ২৩টি কারাগারে ১০ হাজার ১৪০ জন বন্দি নিজের উৎপাদিত পণ্য থেকে লভ্যাংশ পেয়েছেন ৩৪ লাখ ৮ হাজার ৬৭৬ টাকা। পরের বছর আরো চারটি কারাগারে শিল্প কার্যক্রম প্রসারিত হয়। ওই বছর ২৭টি কারাগারে ১২ হাজার ৩৪৮ জন বন্দি তাদের উৎপাদিত পণ্যের লভ্যাংশ হিসেবে পান ৩০ লাখ ৪২ হাজার ১৪৩ টাকা। এর পরের বছর আরো একটি কারাগার এ শিল্পমুখী কার্যক্রমে যুক্ত হয়। ওই বছর ২৮টি কারাগারে ১১ হাজার ২৩৯ জন বন্দি লভ্যাংশ হিসেবে পেয়েছেন ২৭ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৫ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৯টি কারাগারের ১২ হাজার ৭৪০ জন বন্দি নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের লভ্যাংশ হিসেবে পেয়েছেন ৩৪ লাখ ৪৫ হাজার ২০৭ টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে গত অক্টোবর পর্যন্ত ৩০টি কারাগারের ৪ হাজার ৪০৯ জন বন্দি লভ্যাংশ হিসেবে পেয়েছেন ১২ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৭ টাকা। সব মিলিয়ে এ সময়ের মধ্যে কারাবন্দিরা নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের লভ্যাংশ পেয়েছেন ১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৭ হাজার ৪৮ টাকা।

নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে একটি পূর্ণাঙ্গ গার্মেন্ট কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এটিই দেশের কোনো কারাগারে স্থাপিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ গার্মেন্ট কারখানা। সমাজসেবা অধিদপ্তর ও বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহায়তায় ‘কারা গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি’ নামে এ কারখানা নির্মাণ করা হয়। এখানে দুই শিফটে ৩০০ বন্দি কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রাথমিকভাবে ৫৪টি বিদেশী মেশিন নিয়ে এ গার্মেন্টের যাত্রা হয়। এ কারখানায় কাটিং, প্রিন্টিং ও আয়রনসহ সব সেকশনই রয়েছে। কারখানায় প্রতি শিফটে ১৫০ জন করে দুই শিফটে ৩০০ কয়েদি কাজ করতে পারেন। কারাবিধি অনুযায়ী কেবল সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরাই কারাগারের এসব শিল্পে কাজ করার সুযোগ পান। কিন্তু বন্দিজীবনে আয়ের পথ পেয়ে অনেক বিচারাধীন (হাজতি) বন্দিও এসব শিল্পে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

কারা অধিদপ্তরের কারা উপ-মহাপরিদর্শক সুরাইয়া আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, কারা অভ্যন্তরের শিল্পগুলো দেখে অনেক ক্ষেত্রেই হাজতি বন্দিরাও সেখানে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়। বন্দিদের এ ধরনের শিল্পমুখী কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও কমে। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার গত আয়োজনে পুরো একটি প্যাভিলিয়ন সাজানো হয়েছিল কয়েদিদের তৈরি পণ্যে। কয়েদিরা কেবল অপরাধী নন, তারা সৃজনশীল কাজও করতে পারেন, তারই বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয় বন্দিদের উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে। কয়েদিদের তৈরি বাহারি পণ্য তালিকায় রয়েছে পুঁতি দানার হাতব্যাগ, ফুলদানি, নকশিকাঁথা থেকে শুরু করে বুটিক ও বাটিকের থ্রিপিস। প্রায় ২০০ ধরনের পণ্য দিয়ে সাজানো হয়েছিল কারাপণ্য প্যাভিলিয়ন। এসব পণ্য ক্রেতাদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। কারাপণ্যের মধ্যে রাজশাহী জেলা কারাগার থেকে জামদানি, রাজশাহী সিল্ক ছাড়াও ব্লক শাড়ি ও নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে নকশিকাঁথা, চাদর, কার্পেট, বেত ও বাঁশের ফার্নিচার যেমন মোড়া, ইজি চেয়ার, বুক শেলফ, কাঠের ফার্নিচারের মধ্যে সোফা, আলমারি, ফুড কাভার, ফলের ঝুড়ি, ওয়্যারড্রোবসহ বিভিন্ন ধরনের শোপিস, পুঁথির তৈরি বিভিন্ন খেলনা ও শোপিস, তাঁত ও ব্লকের বেডশিট, লুঙ্গি, টাওয়েল। ময়মনসিংহ জেলা কারাগার থেকে পাটের তৈরি ব্যাগ, পাপোশ ও টেবিল ম্যাট। সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে খাবারসামগ্রী বিস্কুট, কেক, মুড়ি, চানাচুর, বিভিন্ন ধরনের আচার বিক্রির জন্য আনা হয়।

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএসএম আনিসুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারাগারে বেশকিছু শিল্প চালু রয়েছে। বর্তমানে দেশের ২৯টি কারাগারে ৫০ হাজারেরও বেশি বন্দি অভ্যন্তরেই বিভিন্ন ধরনের শিল্পে যুক্ত রয়েছেন। কয়েদিদের জন্য দেশের ২৯টি কারাগারে বিভিন্ন ধরনের শিল্পে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের উৎপাদিত পণ্যের লভ্যাংশের অর্ধেক পান বন্দিরা। এ অর্থ তারা পরিবারের কাছে পাঠাতে পারেন। কারাগারে বন্দিদের উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে কাতান ও জামদানির মতো ঐতিহ্যবাহী শাড়িও। এছাড়া হস্তশিল্পের বিভিন্ন সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে নকশিকাঁথা, টিস্যু বক্স, ফুলদানি, বাতিসজ্জাসহ বিভিন্ন সামগ্রী। বন্দিদের উৎপাদিত এসব পণ্য বিক্রির জন্য কাশিমপুর কারাগারে একটি বিশেষায়িত বিপণন কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া বাণিজ্য মেলায় স্টল নিয়েও কারাবন্দিদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করা হয়। কারাবন্দিদের পণ্যগুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চাই আমরা। এজন্য একটি বিশেষায়িত অ্যাপ তৈরির কাজ চলছে। এ অ্যাপের মাধ্যমে কারাবন্দিদের উৎপাদিত পণ্য ইউনিভার্সেল মার্কেটে পৌঁছে যাবে।’