সিলেটের হাওর বিল থেকে মাছ উৎপাদন হয় ৬৯ শতাংশ। পুকুর থেকে আসে বাকি ৩১ শতাংশ। দেশের অন্যান্য জেলায় পুকুরে চাষ করা মাছের আধিক্য বেশি। সে হিসেবে পুকুরে মাছ উৎপাদনে পিছিয়ে সিলেট। এর কারণ হিসেবে সিলেটে পুকুর-বিল ভরাট হয়ে যাওয়াকে উল্লেখ করছেন মৎস্য কর্মকর্তারা। অন্যদিকে চাহিদার তুলনায় জেলায় মাছের ঘাটতি রয়েছে ২ হাজার ৬৯২ দশমিক ৯২০ টন। পুকুরে মাছ চাষ বৃদ্ধি করলে চাহিদার অনেকাংশ মেটানো যেত।
সিলেট জেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় মোট মাছের চাহিদা ৭৮ হাজার ১২০ দশমিক ৩২২ টন। সেখানে মাছ উৎপাদন রয়েছে ৭৫ হাজার ৪২৭ দশমিক ৪০২ টন। জেলায় মাছের চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ২ হাজার ৬৯২ দশমিক ৯২০ টন। এছাড়া সারা দেশে প্রতি বছর ৪৬ লাখ টন মাছ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে পুকুরে চাষ হয় ২৫ লাখ টন। অর্থাৎ ৫৪ শতাংশই পুকুরে চাষ হয় কিন্তু সিলেটে পুকুরে মাছ চাষ হয় খুব কম। এর অন্যতম কয়েকটি কারণ অন্যান্য জেলার মতো এখানে মৎস্য উদ্যোক্তার অভাব, পুকুর-বিল ভরাট হয়ে যাওয়া ও চাষকৃত মাছে ক্রেতার অনীহা। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুকুরে মাছ চাষ যে লাভজনক সে বিষয়টি এ অঞ্চলের অনেকেই বুঝে উঠতে পারেননি।
এদিকে সিলেট জেলায় সরকারি পুকুর রয়েছে ৩১১টি। যার আয়তন ৭৪ দশমিক ৯০ হেক্টর। এসব পুকুরে মাছ উৎপাদন হয় ২১৯ টন। আর বেসরকারি পুকুর রয়েছে ৫৫ হাজার ৩৭টি। যার আয়তন ৫ হাজার ৯৪৮ দশমিক ৭১ হেক্টর। বেসরকারিভাবে মাছ উৎপাদন হয় ২৩ হাজার ৮৭ দশমিক ৬৩ টন। এছাড়া জেলায় বাণিজ্যিক মৎস্য খামার রয়েছে ২৭৭টি। জলমহাল ৬৬৭টি। যাতে উৎপাদন হয় ১২ হাজার ২৫ দশমিক ৪২০ টন মাছ। এছাড়া জেলায় হাওর রয়েছে ৫৫টি। এখানে মাছ উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ৯৯৬ দশমিক ৫৩০ টন। জেলায় ৪১৬টি প্লাবন ভূমি ও ছয়টি অভয়াশ্রম রয়েছে। অন্যদিকে নদনদীও সিলেটে মাছ উৎপাদনের অন্যতম জায়গা। এ রকম নদনদীর সংখ্যা ৩৭টি। যেখানে মাছ উৎপাদন হয় ৪ হাজার ৮০৫ দশমিক ৮৬০ টন। জেলায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে সাতটি মৎস্য হ্যাচারি রয়েছে।
জেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে সিলেট জেলায় মোট মাছের চাহিদা ছিল ৭৮ হাজার টন। মাছের উৎপাদন হয়েছিল ৭৫ হাজার ৩০৮ টন। ঘাটতি ২ হাজার ৬৯২ টন। সিলেট জেলায় মোট মৎস্যজীবীর সংখ্যা ৫৩ হাজার ৬৬ জন, চাষীর সংখ্যা ৩৪ হাজার ৯৯, জেলের সংখ্যা ৩৯ হাজার ৭১৩ জন (নিবন্ধিত)। জেলায় হাটবাজার রয়েছে ২৫৩টি আর মৎস্য আড়ত রয়েছে ১০৫টি।
সিলেট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, সিলেটে ৫৫ হাজার ৩৪৮টি পুকুর রয়েছে। কিন্তু সিলেটের পুকুরে মাছ চাষের পরিমাণ কম। অধিকাংশ পুকুর চাষের বাইরে। দেশের অন্য অঞ্চলে যেখানে পুকুরে চাষ করা মাছের আধিক্য, সেখানে সিলেটে এর পরিমাণ খুবই কম। সিলেটে মোট উৎপাদনের মাত্র ৩১ শতাংশ পুকুরে চাষ করা। পুকুরে মাছ চাষ যে লাভজনক, সে বিষয়টি এ অঞ্চলের অনেকেই বুঝে উঠতে পারেননি। এজন্য পুকুরে মাছ চাষে পিছিয়ে রয়েছে সিলেট।
অন্যদিকে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য চাষ বিভাগের প্রভাষক মো. আবু কাওসার মনে করেন, সিলেট অঞ্চলে মৎস্য চাষে উদ্যোক্তা সৃষ্টি না হওয়া পুকুরে মাছ চাষে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ। যেখানে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শিক্ষিত তরুণের অনেকেই মাছ চাষে উদ্যোক্তা হিসেবে সফলতা পাচ্ছে, সেক্ষেত্রে সিলেট ব্যতিক্রম। এছাড়া সিলেটে হাওরাঞ্চলে এখনো দেশী মাছ পাওয়া যায়। এজন্য চাষের মাছ ক্রেতারা কিনতে চান না। যার জন্য পুকুরে মাছ চাষের ব্যাপারে আগ্রহ কম দেখা যায়।
মো. আবু কাওসার আরো দুটি প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন। তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চলের অনেক এলাকার মাটি একটু লালচে। সে এলাকায় মাছের বেড়ে ওঠা স্বাভাবিক হয় না। এছাড়া মাটিতে প্রচুর আয়রন। অনেক সময় তাদের নিজেদের বিভাগে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মাটিতে আয়রনের জন্য ট্রায়াল ঠিকমতো দেয়া যায় না। তিনি পুকুরে মাছ চাষে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ওপর জোর দেন।
সিলেট বিভাগীয় মৎস্য কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, মৎস্য খাতে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সিলেটের ভয়াবহ বন্যায় মৎস্য খাতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ অবস্থায় বন্যা বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে মাছ চাষ করা যায়, তা ভাবছে সরকার। চাষের সময়কাল পরিবর্তন, স্বল্পসময়ে বৃদ্ধি পায়—এমন জাতের মাছ চাষে উদ্বুদ্ধকরণের বিষয়ে মৎস্য বিভাগ বলছে। তিনি বলেন, সিলেটে পুকুরে মাছ চাষকে আরো গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।










