দেশের বেসরকারি ডিপোগুলোয় স্থাপন করা জ্বালানি পাম্প নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। আইনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার আগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকেও কোনো ধরনের অনুমতি কিংবা অনুমোদনই নেয়া হয়নি।

বণিক বার্তার সরেজমিন অনুসন্ধানে ১০টি ডিপোয় ডিজেল পাম্প চালু রাখার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। এক্ষেত্রে শুধু বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমতি সংগ্রহ করে এ কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছেন ডিপো মালিকরা। সম্প্রতি দেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় একটি দুর্ঘটনার স্থান বিএম কনটেইনার ডিপোও রয়েছে এ তালিকায়। রসায়নবিদরা বলছেন, বিএম ডিপোয় ছড়িয়ে পড়া আগুন যদি কোনোভাবে জ্বালানির পাম্প পর্যন্ত গড়াত তবে দুর্ঘটনার মাত্রা কতটা ভয়াবহ হতে পারত সেটি অনুমান করাও কঠিন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ১৬টি শিল্পগোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের ১৯টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো সচল রয়েছে। বেসরকারি খাতে চালু থাকা এসব অফডকের মধ্যে বিএম কনটেইনার ডিপো ছাড়াও নিজস্ব কাজে ব্যবহারের জন্য জ্বালানির পাম্প স্থাপন করা বাকি নয়টির মধ্যে রয়েছে নগরীর মধ্যম হালিশহর এলাকায় স্থাপিত এছাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ভাটিয়ারীতে পোর্ট লিংক লজিস্টিকস সেন্টার, উত্তর পতেঙ্গার কাঠগড় এলাকায় সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড (পূর্ব ও পশ্চিম), সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি এলাকায় কেডিএস লজিস্টিকস লিমিটেড, পতেঙ্গার লালদিয়ার চর এলাকায় ইনকনট্রেড লিমিটেড, পাহাড়তলীতে উত্তর কাট্টলী এলাকায় গোল্ডেন কনটেইনারস লিমিটেড, নগরীর কাট্টলিতে ভিক্টোরি জুট মিলের জায়গায় অবস্থিত ইস্পাহানি-সামিট অ্যালায়েন্স টার্মিনাল লিমিটেড, কুমিরায় অবস্থিত নেমসান কনটেইনার ডিপো ও ওশান কনটেইনার লিমিটেড। চট্টগ্রাম বন্দরের ১-২৬ কিলোমিটার দূরত্বে এসব ডিপোয় শুল্ক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অনুযায়ী খোলা (বাল্ক) আমদানি পণ্যসহ যাবতীয় রফতানি পণ্য হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোয় বিস্ফোরণ ঘটনার তদন্তে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় গঠিত তদন্ত কমিটিতে যুক্ত আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. দেবাশিস পালিত। বণিক বার্তাকে তিনি বলেছেন, একটি ডিপোয় মেশিনারিজ, পোশাক ছাড়াও বহু ধরনের কেমিক্যাল রাখা হয়। এর মধ্যে রয়েছে দাহ্য পদার্থও। ফলে আমদানি-রফতানিবাহী কনটেইনারের অদূরে জ্বালানি পাম্প থাকাটা সত্যিই বিপজ্জনক। এ ধরনের ডিজেল পাম্প ডিপোর ভেতর আদৌ থাকতে পারবে কিনা কিংবা থাকলে সেটা কতটা দূরত্বে স্থাপন করা হবে, এর তদারকিই-বা কীভাবে করা হচ্ছে; সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যু।

জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এর আগে বিপিসির অনুমোদন ছাড়া কোনো প্যাকড পয়েন্ট, এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর এমনকি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিস্ফোরক লাইসেন্স ইস্যু না করার জন্য প্রধান বিস্ফোরক পরিদপ্তরে অফিশিয়ালি চিঠি দিয়ে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। গত বছরের ২২ জুন বিপিসির তত্কালীন পরিচালক সৈয়দ মেহ্দী হাসান স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু অসাধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিয়ে অবৈধভাবে ডিসপেন্সিং মেশিন বসিয়ে জ্বালানি তেলের ব্যবসা পরিচালনা করছে। বিপিসি বা জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানির লাইসেন্স না নিয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে না। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে শুধু বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিয়ে ভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে মাঠ প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছে। পেট্রোলিয়াম অ্যাক্ট ১৯৭৪ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম আইনের শর্ত অনুযায়ী বিপিসির অধীন কোম্পানির ডিলাররা বিস্ফোরক অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিয়ে জ্বালানি তেলের ব্যবসা পরিচালনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। চিঠিতে বিপিসির অনুমোদন ছাড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলেও বিস্ফোরক লাইসেন্স ইস্যু না করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুধু একটি সংস্থা বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স সংগ্রহ করে ডিপোর মতো স্পর্শকাতর জায়গায় কোনোভাবেই জ্বালানি পাম্প স্থাপন করার সুযোগ নেই। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। আমদানি-রফতানি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে যুক্ত ডিপোয় জ্বালানি পাম্প স্থাপনের আগে বিপিসিসহ বেশ কয়েকটি সংস্থাকে অবগত থাকতে হবে। কোন কোন ডিপোয় এ ধরনের জ্বালানি পাম্প স্থাপন করা হয়েছে, সেটির তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছি। এতদিন সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকলেও এখন যেহেতু বিষয়টি জানতে পারছি, বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে আমরা উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ নেব।

বিপিসির অনুমোদন ছাড়া কীভাবে ডিপোগুলোতে জ্বালানি পাম্প স্থাপনের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন মিটিংয়ে আছেন বলে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

কনটেইনার ডিপো মূলত নিয়ন্ত্রিত সেবা শিল্প। চট্টগ্রামে অবস্থিত ১৯টি ডিপো চট্টগ্রাম বন্দরের সহযোগী হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারখানা থেকে রফতানি পণ্য এসব ডিপোয় এনে কনটেইনারে বোঝাই করা হয়। এরপর শুল্কায়ন শেষে ডিপো থেকে বন্দরে পাঠিয়ে জাহাজে তুলে দেয়া হয়। আর ৩৮ ধরনের আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে নামানোর পর ডিপোগুলোয় নিয়ে খালাস করতে হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দেখবে যে ডিপোয় অপারেশনাল অ্যাক্টিভিটিস ঠিকমতো চলছে কিনা। সেফটি ও সিকিউরিটির দায়িত্ব আমাদের না। তবে জ্বালানি পাম্প স্থাপন করতে হলে নিশ্চয়ই অনেকগুলো সংস্থার অনুমোদনের বিষয় রয়েছে। আর যেহেতু জ্বালানি ইস্যু সেক্ষেত্রে পর্যাপ্ত, সেখানে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও থাকতে হবে। একটা বিষয় আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়িয়ে যেতে কী ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে সেগুলো নিয়ে বেশি কাজ করতে হবে। আমদানি-রফতানি স্বার্থ যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, এ ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে।

ডিপোগুলোয় কনটেইনার পরিচালনার কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব চট্টগ্রাম বন্দরের হলেও শুল্কসংক্রান্ত বিষয়গুলো তদারকির দায়িত্ব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে। ডিপো পরিচালনার জন্য মূল লাইসেন্সও নিতে হয় এনবিআর থেকে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মো. ফখরুল আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ডিপোর ভেতরে জ্বালানি পাম্প আছে, সেটা আমরা আগে জানতাম না। এটাকে সার্ভিস পাম্প বলা হচ্ছে। অর্থাৎ তাদের নিজেদের যানবাহন, ইকুইপমেন্টের কাজে এ ধরনের পাম্প স্থাপন করে জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে। ডিপোর মতো স্পর্শকাতর স্থানে এভাবে সার্ভিস পাম্প বসানো যায় কিনা, সেটা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে।’

কনটেইনার ডিপো সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালে দেশে প্রথম বেসরকারি ডিপো প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত শুধু খালি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করত ডিপোগুলো। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ সাল থেকে এ ডিপোগুলোকে প্রথমবারের মতো রফতানি কনটেইনার পরিচালনার অনুমতি দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এরপর ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে রফতানির পাশাপাশি নির্ধারিত আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার বন্দরের পরিবর্তে ডিপোয় নিয়ে খালাসের অনুমতি দেয়া হয়। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মোট যে পরিমাণ পণ্য রফতানি হয়, তার পুরোটাই পরিবহন করা হয় ১৯টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো থেকে। আর বন্দর দিয়ে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা মোট কনটেইনারের মধ্যে গড়ে ২৩ শতাংশেরও বেশি খালাস হয় এসব ডিপো থেকে। আমদানি-রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনারের সংখ্যা হিসাব করলে গত বছর সবক’টি ডিপো মিলিয়ে মোট ১০ লাখ একক কনটেইনার পরিচালন হয়েছে । এর মধ্যে সাত লাখ রফতানি পণ্যের ও তিন লাখ আমদানি পণ্যের কনটেইনার। আমদানি-রফতানি পণ্য ছাড়াও এর বাইরে একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক খালি কনটেইনারও সংরক্ষণ করে বেসরকারি ডিপোগুলো।

জানতে চাইলে বেসরকারি ডিপো মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি আজই জানতে পেরেছি সাতটি বেসরকারি ডিপোয় জ্বালানি পাম্প রয়েছে। তবে তা কোনগুলো বলতে পারব না। এমনকি বিপিসির অনুমোদন আছে কি নেই, সে বিষয়টিও এখন বলতে পারছি না।