ভোলা শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া বেতুয়া নদী এক সময় ছিল খরস্রোতা। শহরবাসীর দৈনন্দিন চাহিদা ও কৃষকের একমাত্র ভরসা ছিল এ নদীটি। তবে অনেকেই ভুলে গেছে বেতুয়ার নাম। মেঘনার মোহনা বন্ধ করে দেয়ায় স্রোতহীন হয়ে পড়ে নদীটি। ধীরে ধীরে নদীটি মরে যায়। এখন এটি বেতুয়া খাল নামে পরিচিত। প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে খনন না করায় খালটিও পড়েছে অস্তিত্ব সংকটে।
একটা সময় খরস্রোতা নদীটি পার হওয়া ছিল এ অঞ্চলের মানুষের জন্য কঠিন কাজ। সে সময় ভোলা মাঝি নদীটি পার হতেন বলে তার নামে এ জনপদের নাম ভোলা রাখার কথা প্রচলিত রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শহরের একমাত্র খালটি আজ ভরাট হয়ে গেছে শুধু খননের অভাবে। প্রতি বছর যদি খালটি খনন করা যেত তাহলে এ দুরবস্থা হতো না।
মো. হোসেন বলেন, ‘খালটির দুই পাশেই পৌরসভার মার্কেট, কাঁচাবাজার, মাছের বাজার ছাড়াও গড়ে উঠেছে মুদি দোকান। বাজারের বর্জ্য ফেলা হয় খালে। এতে খালটির গভীরতা হারিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।’
তবে মুদি দোকানি ফারুক মিয়া বলেন, ‘বাজারের পাশে খালটি থাকায় ব্যবসায়ীরা আবর্জনা ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতি বছর যদি খালটি খনন করা হতো, তাহলে ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ হতো না।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দখল আর দূষণে খালটির এ করুণ অবস্থা। ব্যবসায়ীদের পণ্যবাহী নৌযান এখন আর সহজে শহরে ঢুকতে পারছে না। কোনো কোনো এলাকায় ঢুকতে পারলেও মূল নদী থেকে শহরে আসতে যেতে পাঁচ-সাত দিন সময় লেগে যাচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। আর তার প্রভাব গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। তাছাড়া বাজারসংলগ্ন স্থানটিতে আবর্জনা ফেলায় খালটি ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় শহর ও আশপাশের নিম্নাঞ্চল।
ব্যবসায়ী মিথুন মোল্লা বলেন, ‘খালটি যখন স্বাভাবিক ছিল, তখন স্রোত ছিল। যে কোনো নৌযান দ্রুত চলাচল করতে পারত। এখন বাজারসংলগ্ন স্থানগুলো দিয়ে খালটি ভরাট গেছে। সেখানে নৌযান চলাচলে একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঢাকা কিংবা দেশের অন্যান্য জায়গা থেকে পণ্য আনতে আগের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ খরচ বেড়ে গেছে।’
হানিফ পালোয়ান নামে আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও ঢাকা থেকে জাহাজে পণ্য আনতে ৩০-৩৫ হাজার টাকা ভাড়া লাগত। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায়। তাছাড়া খালটিতে পানি কম থাকায় অধিকাংশ সময়ই জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে জাহাজ চলাচল করতে হয়। এতে একদিনের জায়গায় লেগে যাচ্ছে তিন-চার দিন।’
এমবি জান্নাত নৌযানের চালক আবু সুফিয়ান বলেন, ‘পাঁচদিন হয়েছে চাঁদপুর থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে ভোলায় এসেছি। অথচ এখনো গুদাম পর্যন্ত পৌঁছাতে পারিনি। দিনে জোয়ার এলে জাহাজ একটু চালিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতেই ভাটা চলে আসে।’
এমবি আল-নুর এন্টারপ্রাইজের চালক সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা বা চাঁদপুর থেকে জাহাজে পণ্য নিয়ে ভোলায় আসতে ১২ ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু ভোলায় এসে বেতুয়া খালে প্রবেশ করে ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে অতিরিক্ত দুই থেকে তিনদিন লেগে যায়। শুধু নাব্য সংকটের কারণে এ ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। দ্রুত এ সংকট উত্তরণে পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই খালটিও বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তবে বিভিন্ন স্থানে দখল হওয়া খালের জমি পুনরুদ্ধারসহ নাব্য সংকট দূর করে পুনরায় খালটির পানিপ্রবাহ ফেরাতে পরিকল্পনা করছে স্থানীয় প্রশাসন। এ লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন আরজু।
বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থান দখলমুক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। শিগগিরই ভোলার খাল দখলমুক্ত করার কাজ শুরু হবে। এর সঙ্গে নাব্য সংকট দূর করার জন্য খালটিকে খনন করা হবে।’
শুধু খালই নয়, সরকারি জমি দখল করে গড়ে তোলা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আজাদ জাহান। তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে শহরের ফুটপাতসহ রাস্তার দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কার্যক্রম শুরু করেছি। এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে আমাদের উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শিগগিরই শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটির নাব্য সংকট দূর করার পাশাপাশি পুরোপুরি দখলমুক্ত করা হবে।’










