চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ওয়েই ফেংহি গত এপ্রিলের শেষ নাগাদ শ্রীলংকা সফরে যান। সে সময় শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ও তার ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। সে সময় প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে বলেছিলেন, নিজ স্বার্থের সুরক্ষা দিতে গিয়ে বরাবরই শ্রীলংকাকে পাশে পাবে চীন। একই সঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে (ইউএনএইচআরসি) শ্রীলংকার পাশে দাঁড়ানোর জন্য চীনকে ধন্যবাদও জানান তিনি।

ইউএনএইচআরসির আলোচ্য বিষয় ছিল রাজাপাকসে ভাইদের অধীনে শ্রীলংকার মানবাধিকার পরিস্থিতি। এ ইস্যুতে বরাবরই চীনকে পাশে পেয়েছেন রাজাপাকসে ভাইরা। তারাও একের পর এক মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে শ্রীলংকার বিনিয়োগ ও অবকাঠামো খাতে চীনকে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হিসেবে ভারত মহাসাগরে মেরিটাইম সিল্ক রোড গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। বেইজিংয়ের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় মিত্র হয়ে এগিয়ে এসেছেন রাজাপাকসে ভাইরা। তাদের আনুকূল্যেই দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপদেশটিতে নিজের অবস্থান ক্রমেই জোরালো করে তুলেছে বেইজিং। চীন এরই মধ্যে শ্রীলংকার হাম্বানটোটা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে তুলে নিয়েছে। সুযোগ পেয়েছে পোর্ট সিটি কলম্বোসহ বেশ কয়েকটি অবকাঠামো প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসারও।

কলম্বোয় এখন রাজাপাকসে ভাইদেরই সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে দেখছে চীন। এ কারণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কলম্বোকে প্রয়োজনীয় সমর্থন ও সহায়তাও দিয়ে যাচ্ছে বেইজিং। অন্যদিকে রাজাপাকসে ভাইরাও নিজ দেশে নানা আলোচনা-সমালোচনাকে উপেক্ষা করেই পোর্ট সিটি কলম্বোসহ চীনা প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

শ্রীলংকা সরকারের দাবি, ১৪০ কোটি ডলারের পোর্ট সিটি কলম্বোই এখন পর্যন্ত দ্বীপদেশটিতে ব্যক্তি খাতের উন্নয়নে নেয়া সবচেয়ে বড় প্রকল্প। সম্প্রতি প্রকল্পটিতে দেশটির পার্লামেন্টও অনুমোদন দিয়েছে। ক্ষমতাসীন পদুজানা পেরামুন্না সংশ্লিষ্টরা বাদে দেশটির রাজনৈতিক মহলের প্রায় সবাই প্রকল্পটির বিরোধিতা করছেন। এমনকি দেশটির প্রভাবশালী বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। তারা বলছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তা শ্রীলংকার সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করবে।

তাদের ভাষ্যমতে, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শ্রীলংকার ভূমিতেই একটি অংশে চীনের অবাধ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে। একই সঙ্গে কিছু এলাকায় কলম্বো সরকারেরও নিয়ন্ত্রণ সীমিত হয়ে পড়বে। বিশেষ করে এ প্রকল্প এলাকায় নিয়ন্ত্রিত জনচলাচল ও মুদ্রা হিসেবে ইউয়ান ব্যবহারের গুজব দেশটিতে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। তবে এসব গুজব, অভিযোগ ও বিরোধিতাকে উপেক্ষা করেই প্রকল্পটিতে অনুমোদন দিয়েছে পদুজানা পেরামুন্না নিয়ন্ত্রিত লংকান পার্লামেন্ট।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শ্রীলংকার বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের মোট বিনিয়োগ ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। এ বিনিয়োগ ঋণের বোঝা ভারী করে তোলার পাশাপাশি কলম্বোর জন্য আরো অনেক অস্বস্তিরও কারণ হয়েছে। ২০১৭ সালে কলম্বোর তত্কালীন সরকার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ৯৯ বছরের ইজারায় হাম্বানটোটা বন্দর চীনের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। এর আগে ২০০৫ সালে শ্রীলংকার তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের উদ্যোগেই হাম্বানটোটা বন্দর নির্মাণে কলম্বোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল বেইজিং।

সমালোচকরা দাবি তুলেছেন, হাম্বানটোটা বন্দরের অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিয়ে পোর্ট সিটি কলম্বো প্রকল্পটি থেকে সরে আসা হোক। যদিও এ দাবিতে কর্ণপাত না করে প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর রাজাপাকসে ভাইরা।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শ্রীলংকায় বর্তমানে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেশটির বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সাইনবোর্ড দেখলেই বোঝা যায়। দেশটির ভাষা নীতি অনুযায়ী, সরকারি সাইনবোর্ডগুলোয় একসঙ্গে তিন ভাষা ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে—সিংহল, তামিল ও ইংরেজি। বর্তমানে দেশটির অনেকগুলো প্রকল্পেই সরকারি সাইনবোর্ডে সিংহল ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহার হলেও তামিল ভাষার জায়গায় স্থান করে নিয়েছে মান্দারিন।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অতীতে মাহিন্দা রাজাপাকসে ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় শ্রীলংকা থেকে অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে বেইজিং। বর্তমানেও তারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। বর্তমান শাসনামলে রাজাপাকসে ভাইরা শুরুতে কূটনৈতিকভাবে ভারতের প্রতি কিছুটা আনুকূল্য দেখালেও শেষ পর্যন্ত তারা চীনের দিকেই পুরোপুরি ঝুঁকে পড়েছেন। এমনকি কূটনৈতিক অবস্থানের দিক থেকেও তাদের মধ্যে বেইজিং ও নয়াদিল্লির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চিন্তা অনুপস্থিত। বিষয়টি উদ্বিগ্ন করে তুলছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে চীনের বৈরী দেশ ভারতকে।

চলতি বছরের শুরুতে ভারত ও জাপানের সঙ্গে ইস্ট কনটেইনার টার্মিনাল (ইসিটি) প্রকল্পের চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয় শ্রীলংকা। সে সময় এ উদ্যোগের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলা হয়, স্থানীয়দের বিরোধিতায় প্রকল্পটি বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে লংকান সরকার। নিজ উপকূলের নিকটবর্তী দ্বীপদেশে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় চীনের তুলনায় এভাবে পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি নয়াদিল্লির কূটনৈতিক মহলের জন্যও অনেক বড় অস্বস্তিকর।

অন্যদিকে রাজাপাকসে ভাইদের সমালোচকদের অভিযোগ, চীনকে আনুকূল্য দিতে গিয়ে একের পর এক বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে কলম্বো। এসব প্রকল্প শেষ পর্যন্ত শ্রীলংকার জন্য হয়ে উঠছে শ্বেতহস্তী পোষার মতো। প্রকল্পগুলো কলম্বোকে ঋণগ্রস্ত করলেও লাভবান করেছে রাজাপাকসে ভাইদের।

(নিউজ ১৮ অবলম্বনে)