পাঁচ বছর ধরে ওভারপ্রাইসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে দেশে তৈরি পোশাকের বিদেশী ক্রেতা প্রতিষ্ঠান মালু এনভির কান্ট্রি ম্যানেজারের বিরুদ্ধে। বেলজিয়ামভিত্তিক এ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের লিয়াজোঁ অফিস রয়েছে বাংলাদেশে। সেখানে কর্মরত কান্ট্রি ম্যানেজার উত্তম কুমার সরকারের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তুলেছে খোদ প্রতিষ্ঠানটিই। শুধু তা-ই নয়, আত্মসাতের এ অর্থ যেকোনো সময় বিদেশে পাচার হওয়ার শঙ্কাও করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, পাকিস্তান, ভারত, তুর্কি, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসে কার্যক্রম রয়েছে মালু এনভির। তারা বাংলাদেশের দোঁয়াশ ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেড ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি কারখানা থেকে তৈরি পোশাক কিনে থাকে। গুলশানে থাকা লিয়াজোঁ অফিস থেকে মূলত মালু এনভির পাঠানো এলসির বিপরীতে পণ্যের গুণগত মান যাচাইয়ের কাজটি হয়ে থাকে।

নিজস্ব অনুসন্ধানে গার্মেন্ট পণ্যের ওভারপ্রাইসিংয়ের (অতিরিক্ত মূল্য ধরা) বিষয়টি উঠে আসার পর এ ঘটনায় গুলশান থানায় মামলা করে মালু এনভি। প্রতিষ্ঠানের মালিক বেলজিয়ামের নাগরিক রোজার ফ্রান্স ভ্যান ক্রেইন বাদী হয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি মামলাটি করেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি লিয়াজোঁ অফিসে কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় উত্তম কুমার সরকারকে। তার মূল কাজ ছিল মালু এনভির এলসি চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশে তৈরি গার্মেন্ট সামগ্রী সংগ্রহ করা এবং তার মান যাচাই করে কোম্পানিকে রিপোর্ট করা। কিন্তু উত্তম কুমার নারায়ণগঞ্জের দোঁয়াশ ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটিকে দেয়া ক্রয় আদেশের বিপরীতে প্রতিটি পণ্যের মূল্যের ওপর কমিশন দাবি করেন। তার চাহিদামতো কমিশন না দিলে দোঁয়াশ ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও তথ্য দিয়ে প্রাপ্ত অর্ডার বাতিল করে দেয়ার হুমকি প্রদান করা হয়।

রোজার ফ্রান্স ভ্যান ক্রেইন অভিযোগ করেন, উত্তম কুমার দীর্ঘদিন ধরে দোঁয়াশ ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের মালিকদের নানা ধরনের হুমকি দিচ্ছিলেন। তার হুমকিতে ব্যবসা হারানোর ভয়ে দোঁয়াশ ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেড গত ২০১৯ সাল থেকে পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে মালু এনভি থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে উত্তম কুমারকে দিত।

নিজস্ব নিরীক্ষার বরাত দিয়ে গত তিন বছরে পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের একটি পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন রোজার ফ্রান্স। তার ভাষ্যমতে, উত্তম কুমার সরকার ২০১৯ সালে ক্রয়কৃত পণ্যের ওপর ২৪ হাজার ৬৯৫ দশমিক ২২ ডলার, ২০২০ সালে ৬০ হাজার ৮২৮ দশমিক ২০ ডলার এবং ২০২১ সালে ৯০ হাজার ৯২৫ দশমিক ৯২ ডলার আত্মসাৎ করেন। সর্বমোট ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪৯ দশমিক ৩৪ ডলার আত্মসাৎ করেন। বাংলাদেশী টাকায় তা ১ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার ৪৪০ দশমিক ৬ টাকা।

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় দোঁয়াশ ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে মালু এনভি আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কিনে আসছে। ২০১৯ সাল থেকে আমাদের কাছে ক্রয়াদেশের বিপরীতে কমিশন দাবি করেন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি ম্যানেজার উত্তম কুমার। কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি ক্রয়াদেশ বাতিলেরও হুমকি দেন। পরবর্তী সময়ে তার পরামর্শেই পণ্যের ওভাইপ্রাইজিং করা হয়। ওভারপ্রাইসিংয়ের ঘটনায় মালু এনভির পক্ষ থেকে কিছুদিন আগে যোগাযোগ করা হলে আমরা তাদের বিস্তারিত জানাই।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ আগে কোম্পানির হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে উত্তম কুমারের প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের বিষয়টি ধরা পড়ে। সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নারায়ণগঞ্জের দোঁয়াশ ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাও বিষয়টি স্বীকার করে জানান, উত্তম কুমারের নির্দেশমতো কমিশন না দিলে গার্মেন্টের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দেবে। ব্যবসা হারানোর ভয়ে গার্মেন্টের মালিকপক্ষ উত্তম কুমারের নির্দেশমতো কাজ করেছে।

গার্মেন্ট পণ্যে ওভারপ্রাইসিং করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে উত্তম কুমারের সেলফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিজের সন্দেহের কথা জানাতে গিয়ে রোজার ফ্রান্স ভ্যান ক্রেইন বলেন, আমি সন্দেহ করছি যে উত্তম কুমার দোঁয়াশ ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেড ছাড়াও অন্যান্য গার্মেন্ট কোম্পানিকে দেয়া ক্রয় আদেশের বিপরীতে প্রতারণার মাধ্যমে কোম্পানির বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। যেকোনো সময় তিনি এ টাকা বিদেশে পাচার করে থাকতে পারেন।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, গার্মেন্ট পণ্যে ওভারপ্রাইসিং করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় একটি মামলা দায়ের হওয়ার পর থেকেই উত্তম কুমারকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু মামলা হওয়ার আগেই তিনি আত্মগোপনে চলে গেছেন।

গার্মেন্ট পণ্যে ওভারপ্রাইসিংয়ের ঘটনা এ খাতে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা জানতে চাইলে বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বণিক বার্তাকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ পেলে আমরা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করি। তা সম্ভব না হলে ওই পক্ষগুলো আইনের আশ্রয় নেয়। এত বড় পোশাক খাতে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেই পারে। তবে গোটা পোশাক খাতে তার প্রভাব ফেলার সুযোগ নেই।