প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় পুষ্টির ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তবে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, রোগের প্রাদুর্ভাব ও জনসংখ্যা অনুপাতে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় রয়েছে সীমাবদ্ধতা। একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পুষ্টির ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি শিশুদের মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদে তীব্র অপুষ্টি দেখা যাচ্ছে। দেশে সি-সেকশনের (অস্ত্রোপচার) মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেয়া মায়েদের মধ্যে অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝা (ডাবল বার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন) বেশি। স্বাভাবিক প্রসবে সন্তান জন্ম দেয়া মায়েদের তুলনায় এসব মায়ের অপুষ্টি দ্বিগুণেরও বেশি বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্যে পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝা হলো—ব্যক্তি, পরিবার ও জনসংখ্যার মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা। এ ওজন বা স্থূলতা খাদ্য সম্পর্কিত অসংক্রামক রোগের সঙ্গে অপুষ্টির সহাবস্থানের মাধ্যমে চিহ্নিত হয়। সাম্প্রতিক দশকগুলোয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যার পরিবর্তন বৈশ্বিক পুষ্টির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটিয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেডিকেল জার্নাল বিএমসি পাবলিক হেলথ গত জুনে ‘হাউ ডাস মোড অব ডেলিভারি অ্যাসোসিয়েট উইথ ডাবল বার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন অ্যামঙ্গ মাদার-চাইল্ড ড্যাডস? আ ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস ইউজিং বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে’ শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণায় অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝার বিষয়টি উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের এ গবেষণার তথ্য মূলত বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস) ২০০৭, ২০১১, ২০১৪ ও সর্বশেষ ২০১৭ থেকে নেয়া হয়েছে। এসব বিডিএইচএস থেকে পৌনে ১৫ হাজার মা ও শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষকদের অন্যতম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক তাসমিয়াহ সাদ সুতপা বণিক বার্তাকে বলেন, মায়েরা স্থূল এবং তাদের শিশুরা অপুষ্ট হলে তাকে ডাবল বার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন বা অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝা বলা হয়। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে সেসব পরিবারের মধ্যে অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝা বেশি। এর হার ৮ শতাংশ। আর নরমাল ডেলিভারি বা স্বাভাবিক প্রসবে অপুষ্টির সমস্যা কম। তবে দিন দিন এ ধরনের অপুষ্টির হার নরমাল ডেলিভারির ক্ষেত্রেও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভবিষ্যতে অন্যান্য নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের মতো বাংলাদেশেও এমন অপুষ্টি বাড়বে।

গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, পারিবারিক স্তরে অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মা ও শিশুর অপুষ্টির এ স্তরের হার ২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝা ২০০৭ থেকে ২০১১ সালে ৪২ শতাংশ, ২০১১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ৫০ শতাংশ বাড়লেও ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালে এসে বৃদ্ধির হার কমেছে। এ সময়ে অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝা বৃদ্ধির হার ছিল ২৫ শতাংশ। বৃদ্ধির হার গড়ে ৩৮ শতাংশ হলেও আগামীতে তা আরো মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। কেননা প্রতি বছর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে (সি সেকশন) সন্তান জন্ম দেয়ার হার আগের থেকে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) শিশুর জন্ম হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। ২০০৭ সালে অস্ত্রোপচারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ শিশুর জন্ম হলেও সর্বশেষ জরিপে তা ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বছরে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মের হার ৪৫ শতাংশ।

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয়া শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝা বেশি উল্লেখ করে গবেষণায় বলা হয়, অস্ত্রোপচারে সন্তান জন্ম দেয়া মা ও শিশুর ডাবল বার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন বা অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝা ২০০৭ সালের জরিপে ৭ শতাংশ, ২০১১ সালের জরিপে ৭ দশমিক ৭, ২০১৪ সালে ৮ দশমিক ৩ এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালে সরকারের জরিপে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে স্বাভাবিকভাবে প্রসব করা প্রসূতি ও তাদের শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝা অপেক্ষাকৃত কম। ২০০৭ সালে ১ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০১১ সালে ২ দশমিক ৪, ২০১৪ সালে ৪ দশমিক ১ ও ২০১৭ সালে এ হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে।

গ্রাম ও শহরের মধ্যে শহরাঞ্চলে মা ও শিশুদের অপুষ্টির প্রভাব বেশি। বিভাগভিত্তিক হিসেবে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝার মাত্রা বেশি। চট্টগ্রাম বিভাগে এমন অপুষ্টিতে ভোগা মা ও শিশুর হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর ঢাকায় ৪ দশমিক ৯, বরিশালে ৪ দশমিক ৮, খুলনা ও রাজশাহীতে ৪ দশমিক ৩ এবং সিলেটে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। এ গবেষণায় রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের তথ্য যুক্ত করা হয়নি।

পারিবারিক স্তরে অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝা বৃদ্ধির পেছনে সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণ হিসেবে সন্তান জন্ম দেয়ার পদ্ধতিকে বলা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয়া শিশুদের অন্ত্রের মাইক্রোবিয়াল পরিবর্তন ও প্রদাহজনক অন্ত্রের রোগের ঝুঁকি থাকে। অতিরিক্ত ওজনের মায়েদের অস্ত্রোপচারে সন্তান প্রসবের ঝুঁকি বেশি। তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াতে বিলম্ব হয়। কেননা অস্ত্রোপচার করলে মায়েরা বুকে দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে অক্ষম থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে অচেতন প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লেগে যায়। যেখানে প্রথম ১ ঘণ্টায় শিশুকে দুধ খাওয়ানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ অপুষ্টির মাত্রা বৃদ্ধির জন্য প্রভাবক হয়ে কাজ করছে। চর্বি ও উচ্চ ক্যালোরি খাবার, শাকসবজিকে উপেক্ষা করে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে মানুষের ধাবিত হওয়ার কারণে অপুষ্টি বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে কোমল পানীয় গ্রহণের হার বেড়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস অ্যান্ড গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল বলেন, সি-সেকশনের অস্ত্রোপচার কে করলেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞ সার্জন প্রয়োজন। প্রথম ১ ঘণ্টায় বুকের দুধ পাওয়া শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সি সেকশনের মান নিশ্চিত করা হচ্ছে না। গ্রামেই এখন বেশি অস্ত্রোপচার হচ্ছে। যে মায়েরা আগে থেকেই দুর্বল, আগে থেকেই অপুষ্টিতে ভুগছে সেসব প্রসূতির অস্ত্রোপচার করার সময় দেখা যায় দু-তিনদিন তারা উঠতে পারছেন না। যারা অ্যানেসথেসিয়া (অচেতন) দিচ্ছেন তারা দক্ষ নন। খরচের কারণে ব্যথানাশক ওষুধ দেয়া হচ্ছে না। সি-সেকশনের প্রথম কয়েক দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় শিশুকে দুধ না খাওয়াতে পারলে বাইরে থেকে এনে দুধ দিলে তাতে সঠিক পুষ্টি পাবে না। পুষ্টিহীনতায় ভুগবে অথবা ওভার পুষ্টি হয়ে যাবে। ওভার পুষ্টিও খারাপ। সন্তান জন্ম দেয়া মায়ের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্য তালিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ২৩০ কোটি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি অতিরিক্ত ওজনের শিকার, যেখানে বিশ্বব্যাপী ১৫০ কোটি শিশু খর্বকায়। তীব্র শ্বাসযন্ত্রের রোগ, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া ইত্যাদির মতো সংক্রামক রোগ বাড়ার পেছনে শিশুদের অপুষ্টি একটি বড় কারণ। একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত স্থূলতা অসংক্রামক রোগের (এনসিডি) একটি প্রধান প্রভাবক। এর মধ্যে হূদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস রয়েছে। এসব রোগ আবার স্ট্রোক, কিডনি রোগকে প্রভাবিত করে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টির দ্বিগুণ বোঝা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেয়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যা মাতৃত্বের পাশাপাশি শিশু স্বাস্থ্যের ওপর অনেক দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি বিরূপ প্রভাব ফেলে। প্রসবের পদ্ধতি অপুষ্টির সঙ্গে যেমন ওজন হ্রাস ও শিশুদের মধ্যে কৃশতা ও মানসিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।