বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছ থেকে গত বছরের নভেম্বরে ৬০০ কোটি টাকার পারপেচুয়াল বা মেয়াদবিহীন বন্ড ইস্যুর অনুমোদন পায় এবি ব্যাংক লিমিটেড। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এ বন্ডে বিনিয়োগের জন্য সাবস্ক্রিপশন শুরু হয়। তবে তিন দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও ক্রেতা খুঁজে পাচ্ছে না ব্যাংকটি। মূলত দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কারণে সেই বন্ড কিনতে কেউ আগ্রহী হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, গত বছরের ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বিএসইসির ৮০০তম কমিশন সভায় এবি ব্যাংকের পারপেচুয়াল বন্ডটি ইস্যুর অনুমোদন দেয়া হয়। এরপর এ বছরের ৩০ জানুয়ারি থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেটির সাবস্ক্রিপশনের মেয়াদ নির্ধারিত ছিল। তবে এ সময়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সাবস্ক্রিপশন না হওয়ায় পরে ২২ মে পর্যন্ত এর মেয়াদ বাড়ানো হয়। তাতেও সাবস্ক্রিপশন না হওয়ায় মেয়াদ আরো তিন মাস বাড়িয়ে করা হয় ২২ আগস্ট পর্যন্ত। তবে বন্ডটি কেনার জন্য এ সময়ও ক্রেতা খুঁজে পায়নি এবি ব্যাংক। তাই ব্যাংকটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ডটির সাবস্ক্রিপশনের মেয়াদ বাড়িয়েছে বিএসইসি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে কিছুটা তারল্য সংকট রয়েছে। এ কারণে বন্ডের সাবস্ক্রিপশনে দেরি হচ্ছে। আরো বেশকিছু ব্যাংকের বন্ডেরও সাবস্ক্রিপশনের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এবি ব্যাংককে বন্ড ইস্যুর সম্মতিপত্রেই করণীয় বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে বন্ডটির সাবস্ক্রিপশন সম্পন্ন না হলে বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যদিকে এবি ব্যাংকের পক্ষ থেকে যদি আবারো সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়, তখন এ বিষয়ে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।

এবি ব্যাংকের ৬০০ কোটি টাকার এ পারপেচুয়াল বন্ডের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি হস্তান্তরযোগ্য, আনসিকিউরড, নন-কিউমুলেটিভ, কন্টিনজেন্ট ও কনভার্টিবল। বন্ডটির ৬০০ কোটি টাকার মধ্যে ৫৪০ কোটি টাকা প্রাইভেট প্লেসমেন্ট ও বাকি ৬০ কোটি টাকা পাবলিক অফারের মাধ্যমে ইস্যুর কথা রয়েছে। ইউনিটপ্রতি অভিহিত মূল্য ১ হাজার টাকা। কুপন হার ৬ থেকে ১০ শতাংশ; যা আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মিউচুয়াল ফান্ড, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, তালিকাভুক্ত ব্যাংক, আঞ্চলিক রুরাল ব্যাংক, ট্রাস্ট, সংগঠন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য যোগ্য ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে ইস্যু করা হবে। এ বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে এবি ব্যাংক এডিশনাল টায়ার-ওয়ান মূলধনের ভিত্তি শক্তিশালী করবে। প্রাইভেট প্লেসমেন্ট ও পাবলিক অফার—উভয় ক্ষেত্রে বন্ডটির ন্যূনতম সাবস্ক্রিপশন ১ হাজার টাকা।

জানতে চাইলে এবি ব্যাংকের কোম্পানি সচিব মো. জসিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এরই মধ্যে প্রাইভেট প্লেসমেন্টের জন্য নির্ধারিত অর্থ সংগ্রহ করা হয়ে গিয়েছে। তবে পাবলিক অফারের ৬০ কোটি টাকা এখনো সাবস্ক্রিপশন হয়নি। বর্তমানে বাজার পরিস্থিতি মন্দা থাকার কারণেই এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। তবে ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে বন্ডটির সাবস্ক্রিপশন সম্পন্ন হয়ে যাবে বলে আশা করছি।’

প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে সংগৃহীত ৫৪০ কোটি টাকার মধ্যে দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক ১০৫, আইএফআইসি ব্যাংক ১০০, এনসিসি ব্যাংক ৬৫, ট্রাস্ট ব্যাংক ৮৯, উত্তরা ব্যাংক ১০ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ১৭১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা বন্ড সাধারণত অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোই কেনে। ফলে এ ধরনের বন্ডের সাবস্ক্রিপশন না হওয়ার ঘটনা দেখা যায় না বললেই চলে। তবে এবি ব্যাংকের দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কারণেই অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এবি ব্যাংকের সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২১ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ হাজার ১১১ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২১ হিসাব বছরে ব্যাংকটি ২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ব্যাংকটির সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ ৫ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। ২০২২ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে এ ঘাটতি সমন্বয়ে ব্যাংকটিকে সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত হিসাব বছরে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৭১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা আগের হিসাব বছরে ছিল ৩৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

সর্বশেষ চলতি ২০২২ হিসাব বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এবি ব্যাংকের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। এ বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির সংরক্ষিত সঞ্চিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৪৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যেখানে আগের হিসাব বছরের একই সময়ে ছিল ৩৭ কোটি টাকা।

এবি ব্যাংকের পারপেচুয়াল বন্ডটির ট্রাস্টির দায়িত্বে রয়েছে এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেড। অ্যারেঞ্জার ও ইস্যু ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছে রিভারস্টোন ক্যাপিটাল লিমিটেড। বন্ডটির অবলেখকের দায়িত্বে আছে বিএমএসএল ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড।