অভিযোগ রয়েছে, ইজারার শর্ত না মেনে প্রতিদিন নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে ৮০০ গুণেরও বেশি বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীন এ ড্রেজিংয়ের কারণে এরই মধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সাইক্লোন শেল্টার, আশ্রয়ণ প্রকল্প, গুচ্ছগ্রামের বহু বাড়িঘর ও শত শত একর ফসলি জমি। এছাড়া অপরিকল্পিত বালি উত্তোলনের কারণে ঐতিহ্যবাহী মাঝেরচরের অর্ধেকের বেশি ধ্বংস হয়ে গেছে, বাকিটুকুও বিলীনের পথে।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মেঘনায় ঘোষিত চারটি বালুমহালের মধ্যে চলতি অর্থবছরে ৩ ও ৪ নম্বর ছোট দুটি মহাল ইজারা নেয় ‘ওয়াদুদ এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘মাহিশা এন্টারপ্রাইজ’ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৩ নম্বর মহালে বছরে ৫২ লাখ ৪৪ হাজার ৯৯৬ ঘনফুট ও ৪ নম্বর মহালে ৩৬ লাখ ৭৩ হাজার ৯৬৩ ঘনফুট বালি উত্তোলনের অনুমতি রয়েছে। অর্থাৎ দুটি মহালে বছরে মোট ৮৯ লাখ ১৮ হাজার ২৫৯ ঘনফুট বালি তোলার কথা। অথচ শতাধিক ড্রেজার বসিয়ে প্রতিদিন দেড়-দুই কোটি ঘনফুট বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে পুরো বছরের অনুমোদিত বালির চেয়ে বেশি পরিমাণ মাত্র একদিনেই উত্তোলন করা হচ্ছে, যা নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে ৮০০ গুণেরও বেশি।

সরজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের উত্তর দিক থেকে শুরু করে শিবপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ দিক পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যেখানে সেখানে বালি তুলছে ড্রেজারগুলো। উত্তোলিত বালি প্রতিদিন ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ ও চাঁদপুরগামী ৭০০-৮০০ বাল্কহেড ভর্তি করে চলে যায়। জানা গেছে, প্রতিটি বাল্কহেডের ধারণক্ষমতা ৩০-৬০ হাজার ঘনফুট পর্যন্ত।

কথা হয় ‘উম্মে হাফসা’ ড্রেজারের মিস্ত্রি জাকির হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, তাদের একেকটি ড্রেজার দিনে আড়াই-তিন লাখ ঘনফুট বালি তোলে। ‘কাজী ড্রেজার’-এর মিস্ত্রি ইমতিয়াজ জানান, দিনে তারা এক-দুই লাখ ঘনফুট বালি তোলেন। বাল্কহেড বেশি এলে তা তিন-চার লাখ ঘনফুটে দাঁড়ায়। অন্যদিকে ‘আরিশা ড্রেজার’-এর মিস্ত্রি গোলাপ মিয়া স্বীকার করেন, স্রোতের কারণে নদীর মাঝখানে না থেকে বাধ্য হয়ে তারা জেগে ওঠা মাঝেরচর-সংলগ্ন এলাকা থেকেই বালি তুলছেন।

সদর উপজেলার কাঁথিয়া ইউনিয়নে মেঘনার মাঝে জেগে ওঠা ‘মাঝেরচর’ একটি পুরনো ঐতিহ্যবাহী চর। এখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস। ধান চাষের পাশাপাশি ক্যাপসিকাম, শসা, তরমুজসহ বিভিন্ন ফসল স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। জানা গেছে, চরের অবকাঠামগত উন্নয়নে ২০২২ সালে আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বালি উত্তোলনের কারণে গত বছরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আরেকটি কোনো রকম দাঁড়িয়ে থাকলেও এর কিছু অংশ ভেঙে গেছে। বাকি অংশও ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়। সেটিও নদীতে চলে গেছে। বিলীন হয়ে গেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিনটি স্কুল। এছাড়া গুচ্ছগ্রামের ৮০০ ঘর নদীতে চলে গেছে। সেখানকার বাসিন্দাদের অনেকে এখন রাস্তার ওপর খোলা আকাশের নিচে কোনোভাবে বসবাস করছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে ওই চরের প্রায় ৫০০ একর কৃষিজমি।

ভোলা সদর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) জিয়াউদ্দিন বলেন, ভোলার মাঝেরচরটি বহু পুরনো চর হওয়ায় সেখানে আবাসস্থল, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বহু স্থাপনা গড়ে উঠেছে। কিন্তু নদীতে বালুমহাল ঘোষণার পরই চরে ভাঙন শুরু হয়েছে।

তবে অতিরিক্ত বালি উত্তোলনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন মহাল ইজারাদার ‘ওয়াদুদ এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী জামিল হোসেন ওয়াদুদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্ধারিত পরিমাণের বাইরে কোনোভাবেই বালি উত্তোলন করা হচ্ছে না।’ তার দাবি, যারা বালুমহাল ইজারা নেয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছে, তারা আমাদের পেছনে উঠেপড়ে লেগে আছে। এসব কুৎসা রটাচ্ছে। মহাল ইজারা নেয়া আরেক প্রতিষ্ঠান ‘মাহিশা এন্টারপ্রাইজ’-এর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি।

তবে মেঘনা বালুমহাল ঘোষণা হওয়ায় ভালো-মন্দ উভয় দিকই রয়েছে বলে জানালেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘নদীর তলদেশে জমে থাকা বালির স্তূপ সরিয়ে দিয়ে নদীর নাব্য সংকটকে দূর করতে ড্রেজিং করা খুবই জরুরি। মহাল ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেখান থেকে বালি উত্তোলন অনেকটাই সুফল বয়ে আনবে। এতে সরকার যেমন রাজস্ব পায়, তেমনি ডুবোচর ধ্বংস হয়ে নদীর নাব্যতা ও গতিপথ ঠিক থাকে। কিন্তু যদি এটি অপরিকল্পিতভাবে ও নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি উত্তোলন করা হয় তাহলে নদী ও জনপদের বড় ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।’

নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত বালি উত্তোলনের বিষয়ে ভোলা জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমন অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি ভোলা সদরের অতিরিক্ত ভূমি কমিশনারের নেতৃত্বে কোস্টগার্ড সদস্যদের নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের লোক যাওয়ার আগেই খবর পেয়ে তারা ড্রেজার ও বাল্কহেডগুলো সরিয়ে ফেলে। নদীতে প্রশাসন মনিটরিং করে।’ তবে কী পরিমাণ বালি উত্তোলন করা হচ্ছে, মেঘনা উত্তাল হওয়ায় তা প্রতিদিন টিম পাঠিয়ে মনিটরিংয়ের সুযোগ হয় না বলে স্বীকার করেন তিনি।