পণ্যভর্তি রফতানি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। গত মাসে বন্দরটিতে রফতানি পণ্যের কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে মোট ৭২ হাজার ৬৪২ একক। বন্দরটির ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এটিই এক মাসে সর্বোচ্চ পরিমাণে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড।

দেশের রফতানি বাড়ার কারণেই বন্দরটি নতুন এ রেকর্ড গড়তে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে বড় কৃতিত্ব দেয়া হচ্ছে তৈরি পোশাক খাতকে। এছাড়া বন্দরটি দিয়ে রফতানি গন্তব্যমুখী অন্যান্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে হিমায়িত খাদ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশল ও রাসায়নিক পণ্য ইত্যাদি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) এখানে রফতানি পণ্যভর্তি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ২ লাখ ৮১ হাজার ৯২৭ একক। এর মধ্যে সর্বোচ্চ হয়েছে গত মাসে—৭২ হাজার ৬৪২ একক। এছাড়া বন্দরে জুলাইয়ে ৭০ হাজার ৭৮৬ একক, আগস্টে ৬৭ হাজার ৪০ ও সেপ্টেম্বরে ৭১ হাজার ৪৫৯ একক রফতানি পণ্যভর্তি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে।

নতুন এ রেকর্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) মো. জাফর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য ওঠানামার চিত্র থেকে সারা দেশের আমদানি-রফতানির চিত্র পাওয়া যায়। অর্থনীতির লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের মোট রফতানি পণ্যের ৯০ শতাংশের বেশি হ্যান্ডলিং হয়। বন্দরের ইতিহাসে গত মাসে পণ্যভর্তি রফতানি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত মাসে বাংলাদেশ থেকে রেকর্ড পরিমাণে পণ্য রফতানি হয়েছে। বন্দরের রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও দেখা যাচ্ছে এরই প্রতিফলন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদকৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে গত মাসে ৪০ হাজার ৫৯২ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়েছে। এক মাসে রফতানির হিসাবে তা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট রফতানির প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। চলতি অর্থবছরের চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ১ হাজার ২৬২ কোটি ডলার বা ১ লাখ ৮ হাজার ৫৩২ কোটি টাকার। এ আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি। এছাড়া কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রফতানি হয়েছে ৪৬ কোটি ডলার, হোম টেক্সটাইল ৪১ কোটি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ৩৬ কোটি, পাট ও পাটজাত পণ্য ৩৩ কোটি ডলারের।

পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, এ রেকর্ড পরিমাণ পণ্য রফতানির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে তৈরি পোশাক খাত। গত অক্টোবরে বাংলাদেশের ৩৫৬ কোটি ডলার বা ৩০ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার পোশাক রফতানি হয়েছে। খাতটির ইতিহাসেও এটি এক মাসে সর্বোচ্চ রফতানির রেকর্ড। চলতি অর্থবছর খাতটি থেকে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছিল ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি ডলারের।

এ বিষয়ে বিজিএমইএর সহসভাপতি ও ওয়েল গ্রুপের পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, পোশাক খাতের ইতিহাসে অক্টোবরে সর্বোচ্চ রফতানি আয়ের রেকর্ড হয়েছে। রফতানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চালকের আসনে থাকতে হবে তৈরি পোশাক খাতকেই। চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও মিয়ানমারে পোশাক উৎপাদনের খরচ বেড়েছে। চীন ও ভিয়েতনাম থেকে প্রচুর ক্রয়াদেশ স্থানান্তরিত হয়ে বাংলাদেশের কারখানাগুলোয় এসেছে। এছাড়া সারা বিশ্বের দেশগুলো চীনের ওপর একক নির্ভরতা কমাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে। রফতানির গতি ধরে রাখতে দেশে বন্দর অবকাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি সড়ক, নৌবন্দর, বিমানবন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে উন্নতি করতে হবে। কারণ লিড টাইম এখনো আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

রফতানিতে তৈরি পোশাকের মধ্যে নিটের রফতানি প্রবৃদ্ধি বেশি। নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহসভাপতি ও ফোর এইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাওহার সিরাজ জামিল বণিক বার্তাকে বলেন, জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে ৭২০ কোটি ডলারের নিট পোশাক রফতানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি। সামনের দিনগুলোতেও পোশাক রফতানিতে উচ্চধারা অব্যাহত থাকবে। কারণ উদ্যোক্তাদের হাতে ক্রয়াদেশ আছে। দেশের অভ্যন্তরে রফতানিতে যাতে ছন্দপতন না ঘটে, সে ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে সময়মতো কাঁচামাল হাতে না পেলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়।