একসময় রাজধানীর পুরান ঢাকার অন্যতম বড় খাল ছিল ধোলাইখাল। এখন সেটি শুধু বেঁচে আছে ৯০০ মিটারের বক্স-কালভার্ট আকারে। ২০২১ সালের শুরুতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) খালটির দায়িত্ব নেয়। তারপর আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো খালটির সীমানাই নির্ধারণ করতে পারেনি ডিএসসিসি। বিশেষজ্ঞরা এর কারণ হিসেবে সদিচ্ছার অভাবকেই দায়ী করে বলছেন, সদিচ্ছা থাকলে আরো আগেই সম্ভব হতো খালের সীমানা নির্ধারণ ও পুনরুদ্ধার। তবে ডিএসসিসির মতে, আড়াই বছর সীমানা নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট নয়।
ইতিহাস বলে, একসময় এ খাল চওড়ায় ছিল প্রায় ১০০ ফুট। বুড়িগঙ্গা নদী থেকে খালটি দুটি চ্যানেল হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে মিলে, যার একটি অংশ শ্যামবাজার থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে মিলেছে শীতলক্ষ্যায়। আরেকটি চ্যানেল বাবুবাজার থেকে সায়েদাবাদ হয়ে ডেমরায় গিয়ে পড়ে। ধোলাইখাল ডিএসসিসির অঞ্চল-৫-এর অন্তর্ভুক্ত। খালের সীমানা নির্ধারণ প্রসঙ্গে ডিএসসিসি ও অঞ্চল-৫-এর পাঁচজন ঊর্ধ্বতন কর্মকতার সঙ্গে কথা হয়। তারা প্রত্যেকেই স্বীকার করেন, খালের সীমানার ব্যাপারে সঠিক কোনো তথ্য তাদের জানা নেই। ধোলাইখাল কোথা থেকে শুরু হয়ে কোথায় শেষ তাও ভালো করে চেনেন না তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খালের সীমানা নির্ধারণ হওয়াটা সবার আগে জরুরি। কিন্তু সেটাই আমরা করতে পারছি না। গত আড়াই বছরে খালের সীমানা নির্ধারণ না হওয়াটা দুঃখজনক।’
সরজমিন দেখা যায়, ধোলাইখালের উন্মুক্ত অংশের দুই পারেই আবর্জনার স্তূপ। খালটি এখন ২৫-৩০ ফুট প্রস্থের। খালের পানিও নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত। যাত্রাবাড়ী, ব্যারাক পুলিশ লাইনস, কেশব ব্যানার্জি রোড, আর কে দাস রোড, আলমগঞ্জ রোড, সূত্রাপুর, নারিন্দা, দয়াগঞ্জের সব ড্রেন এসে উন্মুক্ত হয়েছে খালের অংশে। খালটি মিল ব্যারাক হয়ে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়েছে। খালের দৃশ্যমান অংশটুকুর দৈর্ঘ্য ৯০০ মিটার বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।
ধোলাইখালের সীমানা নির্ধারণ না হওয়ায় খালটি পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন ডিএসসিসির অন্য একজন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে খাল নিয়ে ডিএসসিসি ভালো কাজ করেছে। বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেল নিয়েও আমরা সাহসী কাজ করেছি। মেয়রের সদিচ্ছা থাকলে ধোলাইখাল উদ্ধার করা কঠিন কিছু না। কিন্তু তার আগে সীমানা জানাটা জরুরি। সীমানা জানা থাকলে এতদিনে অনেক রকম কাজ শুরু হয়ে যেত। এ ব্যাপারে কেন সংশ্লিষ্ট দপ্তর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না বিষয়টি বোধগম্য নয়।’
খালটির সীমানার বিষয়ে জানতে চাইলে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান (আরডিআরসি) মোহাম্মদ এজাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খালের সীমানা নির্ধারণ নেই বা সিটি করপোরেশন বিষয়টি জানে না এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। খালটি এতদিন ওয়াসার দায়িত্বে ছিল। ওয়াসার কাছে এর সীমানা ম্যাপ আছে। সিএস ম্যাপেও খালের সীমানা আছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছেও ধোলাইখাল, ধোলাই নদীর ম্যাপ আছে। ওয়াসার সেগুনবাগিচা অফিসে ধোলাইখালের পূর্ণ ম্যাপ আছে। এ খাল ভরাট হয়েছে বেশিদিনের ঘটনা নয়। একটি প্রকল্পের আওতায় এ খালটি ভরাট করে বক্স-কালভার্ট করা হয়েছে। পুরো নেটওয়ার্ক ওয়াসার কাছে আছে। সিটি করপোরেশন যদি দায়িত্বে গাফিলতি করে তাহলে আমাদের কী করার আছে!’
পুরান ঢাকার বাসযোগ্যতা ফেরাতে ধোলাইখাল পুনরুদ্ধারের বিকল্প নেই বলে মনে করেন মোহাম্মদ এজাজ। তিনি বলেন, ‘ ধোলাইখাল পুনরুদ্ধার করা কঠিন কিছু না। নিচে দিয়ে পানিপ্রবাহ থাকবে। ওপরে ভায়াডাক্ট পদ্ধতিতে সড়ক বানাবে। রাজধানীর অনেক অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল প্রকল্পের তুলনায় খুব কম খরচেই ধোলাইখাল পুনরুদ্ধার সম্ভব।’
ধোলাইখাল উদ্ধার করা গেলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা কমার পাশাপাশি পুরান ঢাকার নাগরিক ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করেন নগরবিদ ইকবাল হাবিব। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুরান ঢাকা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এখানে বসবাসরত নাগরিকদের নিয়ে কেউ তেমন একটা ভাবে না। একটু অর্থবিত্তের মালিক হলেই মানুষ নতুন ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়ে যায়। ফলে ঢাকার এ অংশটি রয়ে যায় অবহেলিত।’ জলাবদ্ধতাসহ নাগরিক ভোগান্তি দূর করতে ধোলাইখালসহ পুরান ঢাকার অবৈধ দখলে থাকা জায়গাগুলো উদ্ধারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ধোলাইখালের সীমানা নির্ধারণ না থাকায় খালটি পুনরুদ্ধারের কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই বলে জানিয়েছে ডিএসসিসি সূত্র। খালটির পাশে জলাধার উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ও ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। এ প্রসঙ্গে জানতে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান এবং প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা মো, আবু নাছেরকে ফোন করে, খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।










