বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা হিসেবে দেশের তৃণমূল জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাপক পরিচিত রংপুর দিনাজপুর রুরাল সার্ভিস (আরডিআরএস) বাংলাদেশ। সংস্থাটি রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলকে ঘিরে কার্যক্রম শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে তা ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে বিস্তৃতি লাভ করে ‘ফেডারেশন’ কার্যক্রম। এসব ফেডারেশনে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে পরিচালনা করা হতো বেশকিছু কর্মসূচি। কিন্তু দেশী-বিদেশী তহবিল না পাওয়ায় অর্থ সংকটে জনপ্রিয় এসব ফেডারেশনের কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে লাখ লাখ টাকার ৪০৬ ‘ফেডারেশন’ ভবন ও আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

জানা গিয়েছে, আরডিআরএস বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট জেলাসহ আট জেলায় ৪০৩টি এবং ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলায় তিনটি ফেডারেশনের নিজস্ব জমি ও অবকাঠামো রয়েছে। ১৯৮০ সালের দিকে স্থানীয় পর্যায়ে দল তৈরির মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় ভূমিহীন, দরিদ্র, দিনমজুর, দলিত শ্রেণী, উন্নয়ন সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, দুস্থ ও বিধবা নারী, কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সমন্বয়ে ফেডারেশনগুলো গঠন করা হয়। ফেডারেশন পরিচালনার জন্য সদস্যদের ভোটে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ নয় সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠিত হয়। সহসভাপতি পদটি বাধ্যতামূলক নারীদের জন্য রাখা হয়। এছাড়া ক্যাশিয়ার একটি ও কার্যকরি কমিটির সদস্য পদ পাঁচটি। বর্তমানে এসব কমিটি কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে অকার্যকর বলে সাধারণ সদস্য ও কমিটির ভেতরে থাকারা দাবি করেছেন।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শস্যভাণ্ডার গড়ে তোলা, নারীর ক্ষমতায়নের মতো কাজে সরকার ও সমাজের মূল স্রোতধারায় সংযোগ বা সেতুবন্ধনের উদ্দেশ্যেই গঠন করা হয়েছিল এসব ফেডারেশন, কিন্তু ফান্ড সংকটের কারণে এসব সংগঠন এখন যেন ভূতের বাড়িতে পরিণত হয়েছে। একাধিক ফেডারেশন কার্যালয় পরিদর্শন করে এমন তথ্য উঠে এসেছে বণিক বার্তার চোখে।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চলবলা ইউনিয়নের ‘দিগন্ত চলবলা ফেডারেশন’ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আশরাফ আলী মন্টু ও কার্যকরী কমিটির সদস্য মনোরঞ্জন বর্মণ ভবন ও আসবাবপত্রের জরাজীর্ণ অবস্থা দেখিয়ে বলেন, ১৯৯৬ সালের ১ জুন আমাদের ফেডারেশন স্থাপিত হয়েছে। অফিস ভবনের পাশাপাশি আরডিআরএসের সহযোগিতায় আমরা পাকা শস্য গুদাম নির্মাণ করেছি। আরডিআরএস ও বিভিন্ন বিদেশী সংস্থার অর্থায়ন সহযোগিতায় আমরা শস্যবীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতাম, কিন্তু বর্তমানে আমাদের অবস্থা খুবই করুণ।

তিনি আরো বলেন, নারী-পুরুষ মিলে আমাদের ৭০০ সদস্য রয়েছে। সরকার এ ফেডারেশনগুলোকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূলের নানা অসংগতি প্রতিরোধ করে নির্ভেজাল সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

আদিতমারী উপজেলার পলাশী ইউনিয়নের আদর্শ পলাশী ফেডারেশনের সভাপতি বদিয়ার রহমান বর্তমানে কোনো কার্যক্রম চলছে না দাবি করে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিবন্ধন নবায়নের জন্য সমাজসেবা কার্যালয়ে অসংখ্যবার গিয়েছি। টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আর নবায়ন করতে পারিনি। অনেকটা রাগেক্ষোভে আর যাই না। সবাই শুধু লাভ খোঁজে। এজন্য সভাও হয় না। ফলে সংগঠনটি অকার্যকর হয়ে রয়েছে। অথচ একসময় রমরমা ছিল ফেডারেশনগুলো। তাই ফেডারেশনগুলো যেন আবার প্রাণ ফিরে পায়, এজন্য সরকারসহ দেশী-বিদেশী বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।’

আরডিআরএস বাংলাদেশ লালমনিরহাট কার্যালয়ের সিনিয়র সামাজিক উন্নয়ন কর্মকর্তা ফজলে রাব্বি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলায় ৪৪টি ফেডারেশন রয়েছে। এর মধ্যে আটটি খুবই ভালো চলছে। অন্য ৩৬টিও চালু আছে কিন্তু এগুলোয় শুধু শিডিউল কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়।’

দুই বছর পর পর ফেডারেশনগুলোর কমিটি নবায়ন করতে হয় এবং তিন বছর পর পর অডিট করাতে হয় জানিয়ে আদিতমারী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রওশন আলী মন্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কিন্তু এখানে কোনোটাই ঘটেনি। আমাদের কোনো অফিসারও ফেডারেশন পরিদর্শন করেনি।’

লালমনিরহাট সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নূর-ই-জান্নাত বণিক বার্তাকে বলেন, ২০১৭-২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এ উপজেলার একটি ফেডারেশনও সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে কোনো অর্থ বরাদ্দ পায়নি। তাছাড়া ফেডারেশন থেকেও নবায়ন বা অডিট করা এমনকি অনুদানের জন্যও আবেদন জমা দেয়া হয়নি।

আরডিআরএস-বাংলাদেশের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচির সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর রাশেদুল আরেফিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফেডারেশনগুলো সমাজসেবা থেকে নিবন্ধনপ্রাপ্ত। অনেক ফেডারেশন বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশন থেকে ফান্ড নিয়ে কাজ করছে। আর গ্লোবাল বিশ্বে যেহেতু এখন ফান্ডের সংকট। এ সংকটের কারণে আসলে আমরাও চেষ্টা করছি তারা নিজেদের সঞ্চয় দিয়ে যেন লোকাল রিসোর্সটা মোবিলাইজেশন করে কাজ করতে পারে।’

আরডিআরএস বাংলাদেশ প্রধান দপ্তরের আরটিআই (রাইট টু ইনফরমেশন) ফোকাল পারসন (তথ্য যোগাযোগ) ও সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর কমিউনিকেশন্স সাবরিনা শারমিন ফেডারেশনগুলোর মুখ থুবড়ে পড়ার বেশকিছু কারণ উল্লেখ করে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল লক্ষ্য ছিল ফেডারেশনগুলো টেকসই হবে। যেন বিদেশী কোনো সংস্থা কিংবা আরডিআরএসের ফান্ডের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেরা চলতে পারে। এজন্য তাদের দক্ষতা উন্নয়ন করে দেয়া হয়েছিল। ফেডারেশনের নিজস্ব গাইডলাইন তৈরি করে দেয়া আছে। কিন্তু ফেডারেশনগুলো গাইডলাইন না মেনে চলার কারণেই পিছিয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে ফেডারেশনগুলো মুখ থুবড়ে পড়ার কারণগুলো আমরা চিহ্নিত করার কাজ করছি। এসব ফেডারেশন যেন নিজেরাই চলতে পারে। এজন্য আমরা স্টাডিও করেছি। এখন এগুলো নিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে।’

তিনি আরো জানান, ফেডারেশনগুলো স্থানীয় সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন করেছে। এর মধ্যে ৪০৬টি ফেডারেশনের ২৪৭টি নিবন্ধন পেয়েছে। অবশিষ্টগুলো নিবন্ধনের অপেক্ষায় রয়েছে।