উৎপাদন কোম্পানি থেকে বিতরণ কোম্পানির ডেলিভারি পয়েন্টে গ্যাস পৌঁছে দেয়ার কাজ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)। এ পরিবহন কাজে সিস্টেম লস বাবদ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হয়েছে গ্যাস খাতের একমাত্র সঞ্চালন কোম্পানিটিকে। আর ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নজনিত কারণসহ মোট আর্থিক ক্ষতি ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কোম্পানিটি এখন গ্যাসের সঞ্চালন চার্জ বাড়াতে চায়।

জিটিসিএলের আর্থিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সংস্থাটির ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব আয়-ব্যয়ে কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে ১ হাজার ২১৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোকসান গুনতে হয়েছে গ্যাস সঞ্চালনে সিস্টেম লসজনিত কারণে। এতে গত অর্থবছরে মোট ক্ষতি হয় ৫০৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরে একেবারেই ছিল না। 

আকস্মিক এ সিস্টেম লসের কারণ হিসেবে জিটিসিএল বলছে, উৎপাদন কোম্পানির কাছ থেকে (ইনটেক) নিয়ে বিতরণ কোম্পানির ডেলিভারি পয়েন্টে (অফটেক) গ্যাস সঞ্চালনের পার্থক্যের কারণে এ লোকসান হয়েছে। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পেট্রোবাংলা ও জিটিসিএলের দুজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, গ্যাসের ইনটেক-অফটেক পয়েন্টে এতদিন মিটারিং সিস্টেম ছিল না। ফলে সিস্টেম লসের দায় নিতে হতো বিতরণ কোম্পানিগুলোকে। এখন তারা ইনটেক পয়েন্টে মিটার বসিয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলো কী পরিমাণ গ্যাস গ্রহণ করছে তা দেখতে পাচ্ছে। তাই সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর মিটারিং হিসাবে গরমিলের দায় গিয়ে পড়ছে জিটিসিএলের ওপর। এ সিস্টেম লসের কারণেই বড় লোকসানে সঞ্চালন কোম্পানিটি।

জিটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটি মোট ২০টি ইনটেক পয়েন্টে গ্যাস গ্রহণ করে। এরপর তা ৬৪টি অফটেক পয়েন্টের মাধ্যমে বিতরণ কোম্পানিকে সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে জিটিসিএলের নিয়ন্ত্রণাধীন ২০টি অফটেক পয়েন্ট, বাকি ৪৪টি পয়েন্ট বিতরণ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণাধীন। 

গ্যাস সঞ্চালন কোম্পানিটির নির্ভরযোগ্য এক সূত্র জানিয়েছে, ইনটেক ও অফটেক মিটারগুলোয় গ্যাসের পার্থক্য সংস্থাটির হিসাবে ৩ শতাংশ। এ কারণে সাতটি কমিটির মাধ্যমে মিটারিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা; সিস্টেম লস, ইনটেক ও অফটেক পার্থক্য হ্রাসকরণ; মিটারের ত্রুটি চিহ্নিত; চারটি মিটারিং স্টেশন প্রতিস্থাপন ও মডিউলেশনের কাজ করছে জিটিসিএল।  

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা জিটিসিএলের একমাত্র আয়ের উৎস গ্যাস পরিবহনে ট্রান্সমিশন চার্জ। এটি দিয়েই মূলত কোম্পানি পরিচালিত হয়। পরিচালনেও কোম্পানির গত অর্থবছরে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২১৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নজনিত ক্ষতির পরিমাণ ৫৮১ কোটি ১০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সংস্থাটির নিট লোকসান ১ হাজার ২১৪ কোটি টাকার কাছাকাছি। এরই মধ্যে বিপুল অংকের লোকসান করায় জিটিসিএল তারল্য সংকটে পড়েছে। ফলে সরকারের কাছে যে দায় (ডেপথ সার্ভিস লায়াবিলিটি) তৈরি হয়েছে তা পরিশোধের মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই বলে সংস্থাটি তার বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

সারা দেশে যে পরিমাণ গ্যাস পরিবহন হয় তার ৭০-৭৫ শতাংশই করে জিটিসিএল। গ্যাস সঞ্চালন বাবদ আয় দিয়েই কোম্পানিটি তার পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে কিন্তু গত দুই অর্থবছরে (২০২১-২২ ও ২০২২-২৩) কোম্পানি অব্যাহতভাবে লোকসানে থাকায় চলমান প্রকল্পের কাজ বিলম্বিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জিটিসিএল-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বর্তমানে সঞ্চালন পাইপলাইনসহ জিটিসিএলের বৃহৎ চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়ন ১ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা। এছাড়া সারা দেশে সঞ্চালন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য তাদের ১২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চলমান। তবে অব্যাহত লোকসান চলতে থাকলে চলমান ও নির্মাণাধীন প্রকল্প বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস সঞ্চালনে জিটিসিএলের সিস্টেম লসজনিত বিপুল অংকের এ ক্ষতির কারণ তো দেখি না। সঞ্চালন খাতের কোম্পানি হিসেবে কী পরিমাণ গ্যাস গ্রহণ করেছে এবং কতটুকু সরবরাহ করেছে, তার প্রকৃত হিসাব থাকার কথা। বিশেষ করে অফটেক-ইনটেক পয়েন্টে একটি মিটারের মাধ্যমে গ্যাসের প্রকৃত হিসাব সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো মেনে নেয়। আমাদের দেশে বিদেশী গ্যাস উত্তোলন কোম্পানির (আইওসি) ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য।’

গ্যাস উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে গ্যাসের প্রকৃত হিসাব জানার তেমন উপায় ছিল না। উৎপাদন কোম্পানির উৎপাদন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো তাদের গ্রাহকের কাছে তা বিক্রির পর গ্যাসের হিসাব থেকে পার্থক্যটা জানা যেত। চুরি, অপচয় ও কারিগরি ত্রুটিজনিত কারণে তখন গ্যাস বিক্রি বাবদ লোকসান বিতরণ কোম্পানিগুলোই এককভাবে বহন করত। এখন বিভিন্ন কোম্পানি অফটেক ও ইনটেক পয়েন্টে গ্যাসের হিসাব নিরীক্ষণে মিটার বসাচ্ছে। এর মাধ্যমে মূলত সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আওতাধীন গ্যাসের সিস্টেম লসের প্রকৃত হিসাব জানা যাচ্ছে। কোম্পানির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এটি করা হচ্ছে বলে জানায় পেট্রোবাংলা।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসের প্রকৃত হিসাব নিরূপণে উৎপাদন-সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানির আওতায় বিভিন্ন পয়েন্টে মিটার বসানো হয়েছে, যা এতদিন ছিল না। এক্ষেত্রে প্রতিটি কোম্পানির গ্যাসের প্রকৃত হিসাব পাওয়া যাবে, যার মাধ্যমে সিস্টেম লস সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। আমরা পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে কোম্পানিগুলোকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসার পদক্ষেপ নিয়েছি। একটা পর্যায়ে তা আর থাকবে না। তখন গ্যাস খাতে আর্থিক ক্ষতিও কমে যাবে।’

গ্যাস পরিবহনে জিটিসিএলের সিস্টেম লস নিয়ে কথা বলতে চাইলে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী রুখসানা নাজমা ইছহাক এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি।