বিদ্যুতের চলমান লোডশেডিং যেন লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) পানি সরবরাহের সিডিউল। এমনিতে নগরীতে রয়েছে তীব্র পানির সংকট। চাহিদার বিপরীতে পানি সরবরাহ করতে পারছে না সিসিক। দৈনিক আট কোটি লিটার পানির চাহিদা থাকলেও সিসিকের রয়েছে মাত্র চার কোটি লিটার পানির চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা। এর মধ্যে লোডশেডিংয়ের কারণে পানি সরবরাহের সিডিউলে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে সিলেট নগরীর পানির গ্রাহককে।

গত জুলাই থেকে সিলেটসহ সারা দেশে লোডশেডিংয়ের জন্য শিডিউল ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর থেকে নগরীতে টানা ৬-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকছে না বিদ্যুৎ। এর প্রভাব পড়ছে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও। আগে অনেক জায়গায় দুবার পানি দেয়া হলেও গত বছর থেকে বিভিন্ন এলাকায় একবার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। আগে এলাকাভিত্তিক একটা সময় নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে আর সেটি নেই। ফলে এক এলাকায় কখনো সকালে, কখনো দুপুরে, কখনো বিকালে আবার কখনো সন্ধ্যায় পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। কোনো এলাকায় টানা ২-৩ ঘণ্টা পানি দেয়ার সময় ওই এলাকা লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে পানি ধরে রাখতে পারে না।

সিসিক সূত্র জানায়, নগরীতে অনুমোদিত গভীর ও অগভীর নলকূপের সংখ্যা মাত্র ৫ হাজার ১৭৯টি। নগরীতে রয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার হোল্ডিং। যার মধ্যে মাত্র ১৬ হাজার ৫০০ জন সিসিকের পানির গ্রাহক। এ সাড়ে ১৬ হাজার গ্রাহককেও নিয়মিত পানি সরবরাহ করতে পারে না সিসিক। পানি সরবরাহ করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে নগর কর্তৃপক্ষকে। ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা মেটাতে ব্যক্তিগত খরচে নলকূপ স্থাপন করছেন অনেকে। আবার সিসিকের জটিল নীতিমালার কারণে অনেকে চাইলেও গভীর নলকূপ স্থাপন করতে পারেন না।

অন্যদিকে পানির সমস্যা সমাধানে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও সমাধান এখনো অধরা। সিলেট নগরীতে ওয়াসা গঠনের ঘোষণা এলেও এখনো এর কার্যক্রম শুরু হয়নি।

সিসিক সূত্র জানায়, প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কুশিঘাট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। প্লান্টটি থেকে প্রতিদিন ২ কোটি ৮০ লাখ লিটার পানি উৎপাদন করা হচ্ছে দাবি করছে সিসিক। তবে বর্তমানে লোডশেডিংয়ের কারণে কমেছে পানি উৎপাদনের পরিমাণ। এছাড়া পানি সমস্যা সমাধানে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রক্রিয়াধীন চেঙ্গেরখাল পানি শোধনাগার প্রকল্পটির কাজ থমকে রয়েছে বেশ কিছুদিন ধরে। সিসিকের পক্ষ থেকে ওই প্রকল্পের পরিধি ও খরচ বাড়িয়ে ৭৩২ কোটি টাকার একটি সংশোধিত আবেদন গত বছরের ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেটি বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে চাহিদার তুলনায় কম পানি উৎপাদন হওয়ায় সিলেট নগরীতে প্রায়ই দেখা দেয় পানির সংকট। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। সম্প্রতি লোডশেডিংয়ের কারণে পানি সমস্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন উৎস থেকে পানির চাহিদা মেটাতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে। এছাড়া সিসিকের আয়তন বাড়ায় বর্ধিত এলাকায়ও রয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। দিন দিন চাহিদা বাড়লেও বাড়ছে না পানি সরবরাহ।

এদিকে পানি সরবরাহ প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ রয়েছে নগরবাসীর। নগরীর কোনো কোনো আবাসিক এলাকায় সারা দিনে মাত্র একবার পানি সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নগরীর বাগবাড়ী এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, লোডশেডিংয়ের অজুহাত দেখিয়ে দিনে একবার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তাও আবার প্রয়োজনের তুলনায় কম। দীর্ঘদিন পানি সমস্যায় ভুগছি। সিটি করপোরেশন পানির বিল আদায় করে অথচ চাহিদামতো পানি দেয় না।

সিসিকের বর্ধিত এলাকা নোয়াখুররমখলার বাসিন্দা মুতলিব মিয়া বলেন, আগে টুকেরবাজার ইউনিয়ন পরিষদ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিল। সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর পানি সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে অনেকেই নিজ উদ্যোগে গভীর নলকূপ স্থাপন করায় আমাদের নলকূপে পানি উঠছে না। চরম বিপদে রয়েছি আমরা।

এ ব্যাপারে সিসিকের পানি শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী আকবর বলেন, গত মাস থেকে দৈনিক শিডিউল লোডশেডিং থাকার কারণে একদিকে পানি উৎপাদনে যেমন ব্যাঘাত ঘটছে, অন্যদিকে সরবরাহের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হচ্ছে সংকট। ফলে সিডিউল ঠিক রাখা যাচ্ছে না। কারণ পানি সরবরাহকালে কোনোপ এলাকা এক ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের কবলে পড়লে সে এলাকার মানুষ পানি সরবরাহ কম পেয়ে থাকেন। এর পরও আমরা চেষ্টা করছি, সব এলাকায় যাতে একবার হলেও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শিগগিরই পানির সংকট সমাধানের খুব একটা আশা নেই। তিনি বলেন, চাহিদার চেয়ে পানি উৎপাদন আগ থেকেই কম হচ্ছে। নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পানি সমস্যা আর থাকবে না।