দেশের উপকূলীয় ১৯ জেলার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমের অংশটি পড়েছে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে। জোয়ারের সময় এ অঞ্চলের কৃষিজমি তলিয়ে যায় নোনা পানিতে। ভাটায় পানি চলে গেলেও থেকে যায় লবণ। ফলে উপকূলের লবণাক্ত জমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। তাই বেছে নিতে হয় চিংড়ি চাষকে। আবার বন্যা কিংবা জলোচ্ছ্বাস হলে তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ অঞ্চল, ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে জনজীবন ও সম্পদ। এসব সমস্যার সমাধান ও কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ষাটের দশকে উপকূলে নেদারল্যান্ডস মডেলের বাঁধ দেয় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। নির্মাণকালে বলা হয়, সবুজ বিপ্লব ঘটাবে এসব বাঁধ।
স্থানীয়দের সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলে জানা গেছে, শুরুর দিকে বাঁধের সুফল মিলেছে রাতারাতি। নোনা পানির প্রবেশ ঠেকিয়ে দিতে পারায় উপকূলের জমিতে শুরু হয় কৃষিকাজ। কিন্তু ভুল পরিকল্পনায় দেয়া এসব বাঁধের কারণে এক দশকের মাথায় দেখা দেয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। উপকূলীয় এলাকার ছোট-বড় অনেক নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় হুমকির মুখে পড়ে কৃষি ও চিংড়ি চাষ। শুধু তা-ই নয়, ধ্বংস হচ্ছে সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্যও। ফুরিয়ে আসছে মিঠা পানির জোগান।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চিংড়িচাষী গাজী আলাউদ্দিন। ১০ বছরের বেশি সময় ধরে চিংড়ি চাষের সঙ্গে জড়িত। উপজেলার পুটিয়ামারীতে ৩৭ বিঘা জমির ওপর গড়া তার মত্স্য খামার এখন লোকসানে ভরাডুবি। লাভের মুখ দেখতে না পাওয়ায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পেশা বদলের। তবে দীর্ঘ সময় নোনা পানিতে চিংড়ি চাষের কারণে জমির উর্বরা শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। তাই অন্য কোনো ফসল আবাদও সম্ভব নয়। আলাউদ্দিনের মতো উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা সংকুচিত করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে নেদারল্যান্ডস মডেলের বাঁধ। মূলত প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটাকে স্থায়ীভাবে বাধাগ্রস্তের কারণেই ওই অঞ্চলের প্রাণ-প্রকৃতি আজ হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেদারল্যান্ডস একটি নদীমাতৃক দেশ হলেও বাংলাদেশের নদীর প্রকৃতির সঙ্গে রয়েছে সুবিশাল তফাত। দুই দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের নদীর মধ্যে বড় পার্থক্য হলো জোয়ার-ভাটা। বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে জোয়ার-ভাটা হয়, নেদারল্যান্ডসে তা হয় না। ফলে পাউবোর অধীনে নির্মিত নেদারল্যান্ডস মডেলের বাঁধ দেয়ার কারণে উপকূলীয় এলাকার নদ-নদীর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে শুরুর কয়েক বছর উপকূলবাসী সুবিধা ভোগ করলেও ধীরে ধীরে ভুল পরিকল্পনার প্রভাব স্পষ্ট হতে থাকে। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে সমস্যা এখন আরো ঘনীভূত হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে।
উপকূলীয় এলাকার এসব বাঁধ বন্যাপ্রবণতা কমাতে পেরেছে কিনা এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বুয়েট), চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (চুয়েট) ও ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের তিন শিক্ষক একটি গবেষণা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, উপকূলে বাঁধের কারণে মৌসুমি বন্যার পরিমাণ অন্তত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। একইভাবে ২০০৭ সালে প্রলয়ংকরী সিডর-পরবর্তী অন্তত ১৮ শতাংশ এলাকা বেশি প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাসের সময় বাঁধের ভেতর যে পানি জমে যায় সেটি পাম্পিং করে কিংবা স্লুইস গেট দিয়ে নদীতে ফেলা হয় না। ফলে জলাবদ্ধতা ও বন্যা দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করে।
ঢালাওভাবে সব জায়গায় বাঁধ দেয়াই উপকূলীয় এলাকায় এর সুফল না পাওয়ার বড় কারণ। এতে উল্টো চিরস্থায়ীভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে জোয়ার-ভাটা। সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোথায় বাঁধ প্রয়োজন আর কোথায় প্রয়োজন নেই, বিষয়টি পাউবোর কর্মকর্তারা গবেষণা করে দেখেননি। তারা ঢালাওভাবে পুরো উপকূল বাঁধের আওতায় নিয়ে এসেছেন। শুরুর দিকে এসব বাঁধের কিছু সুফল আমরা পেয়েছিলাম। ফসলও হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে এসব বাঁধের দুর্বলতা ফুটে ওঠে। বিশেষ করে কৃষিজমিতে ব্যাপক জনবসতি বাড়তে থাকে। জনবসতির পাশাপাশি অনেক সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতও এসব এলাকায় গড়ে ওঠে। তবে এ অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই জীবনযাপন করতে হচ্ছে।’
পরিবেশবাদীরা বলছেন, বাঁধ দিয়ে জোয়ার-ভাটা বাধাগ্রস্ত করার কারণেই উপকূলীয় এলাকার প্রাণবৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে। ভুল পরিকল্পনায় বাঁধ নির্মাণের ফলে কপোতাক্ষ নদের একটা অংশসহ রূপসা, ভদ্রা, পায়রাসহ অনেক ছোট-বড় নদ-নদী ও খাল শুকিয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, এসব এলাকার বিল ও কৃষিজ অর্থনীতির মেরুদণ্ডও ভেঙে গেছে। বাঁধের আগে এসব এলাকায় ছয় মাস পানি থাকত। তখন নোনা পানিতে চিংড়ি চাষ হতো। বাকি ছয় মাস ফলানো হতো ফসল। কিন্তু বাঁধ দেয়ার পর এসব এলাকায় নোনা পানি প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে চিংড়িচাষীরা কৃত্রিম উপায়ে বা বাঁধ ফুটো করে নোনা পানি এনে চিংড়ি চাষ করছেন। কিংবা মিঠা পানিতে বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে মাছ চাষ করছেন। এতে চিংড়ি উৎপাদন যেমন কমেছে, একইভাবে জমির উর্বরা শক্তিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
উপকূলে ঢালাওভাবে বাঁধ নির্মাণ ভুল ছিল বলে মন্তব্য করেছেন রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কিছু এলাকায় নেদারল্যান্ডস মডেলের বাঁধ দরকার ছিল। কিন্তু ঢালাওভাবে সব এলাকায় তা নির্মাণ করাটা ছিল মস্ত বড় ভুল। যেমন খুলনার কয়রাসহ আশপাশ এলাকায় জোয়ারের পানির সঙ্গে প্রচুর পলি আসে। এসব পলি উপকূল এলাকার ভূমি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন নদীর পানি খালে ও বিলে যায় তখন পলির মাধ্যমে ভূমি গঠন হয়। এখন আপনি যদি নদীর পাড়ে বাঁধ দেন তাহলে ওই পলি তলদেশে জমা হয়ে একটা পর্যায়ে নদী ভরাট হয়ে যায়। উপকূলীয় এলাকায় অনেক নদ-নদী এরই মধ্যে ভরাট হয়ে গেছে অথবা খালে রূপ নিয়েছে। আমরা বলছি, উপকূলীয় এলাকায় বাঁধের ক্ষেত্রে জোয়ার-ভাটাকে প্রাধান্য দিয়ে ডিজাইন করতে হবে। কোন এলাকায় বাঁধ প্রয়োজন আছে আর কোন এলাকায় প্রয়োজন নেই তা সমীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
উপকূলীয় এলাকার বাঁধগুলো ব্যর্থ হওয়ার পেছনে রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বহু বছর ধরে এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। ফলে জলোচ্ছ্বাসের সময় বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। তাছাড়া মৌসুমি বৃষ্টির সময় স্লুইস গেট খুলে পানি বের করা হয় না। এসব দুর্বলতার কথা স্বীকার করেছেন পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (খুলনা অঞ্চল) মো. সফি উদ্দিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বাঁধগুলো অনেক পুরনো। অনেক জায়গায়ই সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না। তবে বাঁধের কারণে পরিবেশ-প্রকৃতি ও এলাকাবাসীর জীবন-সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে এটি সঠিক নয়। আমি নিজেও উপকূলের সন্তান। আমার চাকরির অভিজ্ঞতা ৩০ বছরের। বাঁধের ফলে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস থেকে মানুষ জীবন বাঁচাতে পারছে। নদ-নদী সুরক্ষিত হচ্ছে। তবে খাল ও নদীর কোথাও কোথাও পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে, এটা ঠিক। এটাও তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাই আমরা খননকাজও করছি। সার্বিকভাবে বাঁধের কারণে বিপুল জনগোষ্ঠী উপকৃতই হয়েছে।’










