ক্ষোভ নিয়েই চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরসংলগ্ন লালদিয়ার চর ছাড়ছেন সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা। পুনর্বাসনের দাবিতে আন্দোলনরত বাসিন্দারা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ উচ্ছেদ কার্যক্রমে অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি। লালদিয়ার চরে উচ্ছেদ হওয়া জমিতে এখন পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) ব্যাকআপ ইয়ার্ড প্রস্তুত করার পরিকল্পনা নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, পতেঙ্গায় বিমানবন্দর ঘাঁটি সম্প্র্রসারণের জন্য ১৯৭২ সালে কয়েক হাজার স্থানীয় বাসিন্দাকে সরিয়ে লালদিয়ার চরে পুনর্বাসন করে তত্কালীন সরকার। এ চরের ভূমি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুকূলে বিএস জরিপে অন্তর্ভুক্ত। উচ্চ আদালতের নির্দেশ মানতে গতকাল লালদিয়ার চরের স্থাপনা উচ্ছেদ সম্পন্ন করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক হাজার সদস্য ও উচ্ছেদ পরিচালনায় ভারী যন্ত্রপাতিসহ সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরের পক্ষ থেকে। যদিও এলাকার বাসিন্দারা এর প্রতিরোধ কিংবা কোনো বাধা না দিয়ে নিজেরাই ঘর-বাড়ির কাঠামোগুলো সরিয়ে নিচ্ছেন। উদ্ধার হওয়া জমি কাঁটাতারের সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হচ্ছে বন্দরের পক্ষ থেকে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উচ্ছেদ কার্যক্রমটি আমরা শান্তিপূর্ণভাবে করতে পেরেছি। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কিছু পরিবারকে বন্দরের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেয়া হবে। আগের উদ্ধার হওয়া ২৬ একরসহ সব মিলিয়ে এখন এখানে প্রায় ৭৫ একর জায়গা আমাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। লালদিয়ার চরে লালদিয়া মাল্টিপারপাস টার্মিনাল গড়ে তোলার পরিকল্পনা থেকে সরে আসা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া জমিতে এখন পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) ব্যাকআপ ইয়ার্ড প্রস্তুত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন চেয়েছিলেন চরে বসতি স্থাপনকারী পরিবারগুলো। কারণ ১৯৭২ সালে বিমানঘাঁটি সম্প্র্রসারণের সময় স্থায়ী বন্দোবস্ত পাওয়ার আশ্বাসের ভিত্তিতেই নিজেদের ভিটামাটি ছেড়ে লালদিয়ার চরে বসতি শুরু করে সেখানকার স্থানীয় প্রায় ১৩০ পরিবার। পরে যারা এখানে ভাড়ায় থেকেছেন, তাদের বিষয়টি ভিন্ন। কিন্তু বিমানঘাঁটি সম্প্রসারণের সময় স্থানীয় ভিটা থেকে যাদের লালদিয়ার চরে বসতির সুযোগ করা দেয়া হয়েছে, এদের ব্যাপারে পুনর্বাসনের কোনো পদক্ষেপই নেয়নি বন্দর কর্তৃপক্ষ। সময়ের ধারাবহিকতায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা লালদিয়ার চরে বেচাকেনা করেছেন ভিটামাটি। ভোটের মাঠে নেমে তারা লালদিয়ার মানুষকে আশ্বাস দিয়েছেন, স্থায়ীভাবেই এ জায়গার মালিকানা পাবেন তারা। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা পেয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ লালদিয়ার চরে উচ্ছেদের উদ্যোগ নিলে তা এখন ভেস্তে গেছে।
সরেজমিন গতকাল পতেঙ্গার বিমানবন্দর রোডসংলগ্ন লালদিয়ার চরে ১২ নম্বর ঘাটের পাশে দেখা যায়, সেখানকার বাসিন্দাদের কেউ কেউ বাড়ির টিনের চালাটি খুলে উঠোনে বসে আছে। বাড়ির ইট ও দরজাগুলো করো কাছে বিক্রি করে চলে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে। আসবাব নিয়ে ভাড়া বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন কেউ। প্রায় সব বসতঘর ও দোকানের সব মালামাল বের করে নিয়েছে বাসিন্দারা। ভ্যান ও শত শত পিকআপ সারিবদ্ধ করে দাঁড় করানো। কেউ ঘরের চালার টিন নিচ্ছে, কেউ কেউ ইট, দরজা-জানালা খুলে নিয়ে যাচ্ছে।
চরের স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলী নূর (৫৯) জানান, জহুরুল হক বিমানঘাঁটিতে ছিল আমাদের বাপ-দাদার ভিটাবাড়ি। আরো ছয় ভাইসহ লালদিয়ার চরে এসেছি নয় বছর বয়সে বাবার সঙ্গে। মুজিব সরকারের আমলে বিমানঘাঁটি সম্প্রসারণের সময় স্থায়ী বন্দোবস্ত দেয়ার কথা বলে নিজেদের ভিটামাটি ছেড়ে লালদিয়ার চরে আনা হয়েছিল তখন আমাদের। সরকারের প্রয়োজনে নিজের বাপ-দাদার ভিটা ছাড়তে হয়েছে, আর এখন কোনো পুনর্বাসন না করেই এখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এটা অন্যায়। খোলা আকাশের নিচে বসে আছি। এখনো জানি না পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোথায় যাব। কোথাও বাসা ভাড়া নেয়ার সামর্থ্যও নেই।
চরের উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক আলমগীর হাসান বলেন, আমরা পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের বিরোধিতা করেছিলাম। এ উচ্ছেদ নিয়ে আমাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তাতে মনে হলো, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক নই। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে এর চেয়ে অনেক ভালো আচরণ করা হয়েছে। লালদিয়ার চরে ১৪ হাজারের মতো মানুষ রয়েছেন। যাদের বাপ-দাদার ভিটা থেকে সরিয়ে লালদিয়ার চরে রাখা হয়েছিল, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ হলে এতগুলো মানুষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? পুনর্বাসন ছাড়া এ উচ্ছেদ কার্যক্রমের দায় এড়াতে পারবে না বন্দর কর্তৃপক্ষ।










