জনগণের প্রত্যাশাই একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং এর ভিত্তিতেই কূটনৈতিক অবস্থানকে দৃঢ় করতে হবে। সার্বভৌম স্বায়ত্তশাসন কার্যকরভাবে প্রয়োগ না করলে কার্যকর কূটনীতি সম্ভব নয়, তাই নিজের স্বার্থে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো জরুরি। ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেগুলো চিহ্নিত করে ধীরে ধীরে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে হবে এবং নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। একইসঙ্গে নীতিনির্ধারণে খোলামেলা আলোচনা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে একটি কার্যকর ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠে কূটনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান নিতে পারে।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে ‘ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ (এফএসডিএস) আয়োজিত ‘বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ইরানের টিকে থাকা: অসম সহনশীলতা, আঞ্চলিক পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক বিপর্যয়ের যুক্তি’ শীর্ষক আলোচনায় সভায় বক্তারা এসব বলেন। নিজেদের গবেষণা কার্যালয়ে এ অনানুষ্ঠানিক সভার আয়োজন করে এফএসডিএস।

এফএসডিএসের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন। সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি ড. ইশারফ হোসেনের সঞ্চালনায় এতে মূল বক্তব্য দেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফএসডিএসের প্রিন্সিপাল রিসার্চ ফেলো শাফায়াত আহমেদ। আরো বক্তব্য দেন সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান, নিউ নেশনের সাবেক সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার ও সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা।

সভায় আরো ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) একেএম হুমায়ুন কবীর, ওসমানী সেন্টারের পরিচালক কমোডর (অব.) মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক রাষ্ট্রদূত এডমিরাল মোস্তাফিজুর রহমান, এয়ার কমোডর (অব.) শফিকুল ইসলাম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মঞ্জুর কাদের, এআইইউবির রেজিস্ট্রার ড. শহিদুল ইসলাম খান, আলাউদ্দীন মোহাম্মদ ও আইইউবি’র শিক্ষক তাহমিদ রেজুয়ান।

এ সময় বক্তারা সার্বভৌম স্বায়ত্তশাসন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে না পারলে কূটনীতি সফল হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন। তারা দেশের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান, আমলাতান্ত্রিক দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে গভীর পর্যালোচনা উত্থাপন করেছেন। বর্তমানে অ-রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর কাছ থেকেও হুমকি আসছে উল্লেখ করে গভীর ভাবনা পেশ করেন তারা।

এ সময় তারা আরো বলেন, একটি রাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত নিজস্ব সার্বভৌম স্বার্থে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে না পারে, ততক্ষণ সে কার্যকর কূটনীতি পরিচালনা করতে পারে না। কূটনীতির মূল শক্তি হলো নিজের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেয়া। বক্তারা মালদ্বীপের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশটির পার্লামেন্ট ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি তাদের সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

বক্তারা বলেন, জনগণের প্রত্যাশা একটি সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলন জনগণের মধ্যে যে চেতনা তৈরি করেছে, তা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রকে আরো দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে। দেশের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে সমালোচনা করে বলেন, আমলারা এখন নিজেদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন না। এর ফলে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বক্তারা আরো বলেন, সরাসরি কোনো দেশের অনুসরণ নয়, বরং তাদের কৌশল, ধৈর্য ও দৃঢ়তা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে কূটনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

জনগণকে পররাষ্ট্রনীতির বাইরে রাখা ও কৌশলগত পরিকল্পনার অভাবকে প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখছেন তারা। তারা বলেন, জনগণকে পররাষ্ট্রনীতিতে সম্পৃক্ত না করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব দেশের কূটনৈতিক সক্ষমতাকে সীমিত করেছে। শুরু থেকেই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কগুলো দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় ছিল। আমরা কখনোই নিজেদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে পারিনি। ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের উপস্থিতি শক্তিশালী হয়নি।

বন্ধু রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা করে বক্তারা বলেন, কেবল বন্ধুত্ব দিয়ে কূটনীতি চলে না, নিজস্ব শক্তিও থাকতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেশের কূটনৈতিক শক্তি ও নীতিগত দৃঢ়তা উভয়ই দুর্বল বলে মন্তব্য করেন তারা।

তারা সতর্ক করে বলেন, জাতীয় ঐক্য ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির অভাব থাকলে কূটনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই পররাষ্ট্রনীতিকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রেখে একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।

বক্তারা বলেন, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা পরিচালনার জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বৈদেশিক নীতিকে অনুসরণ করা প্রয়োজন। তারা উল্লেখ করেন, তার কূটনীতির মূল ভিত্তিই ছিল জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া।