বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধের ব্যাপারে যে সব বিবৃতি দিয়েছে, সে ব্যাপারে আমাদের কিছু কষ্টের জায়গা আছে—ঢাকায় ইরান দূতাবাসে আজ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন দেশটির রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ইরান দূতাবাস।

জলিল রহিমি বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের বন্ধু ও ভাই। আমাদের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের ছয়টি জাহাজ হরমুজ প্রণালীতে রয়েছে। জাহাজগুলো যাতে নিরাপদে আসতে পারে, সে ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার আমাদের কাছে সহায়তা চেয়েছে। আমরা বিষয়টি জানিয়েছি এবং এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।’

রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, ‘আমরা যতদিন আছি, এ অঞ্চলে আমাদের মুসলিম ভাইরা বিন্দুমাত্র ভোগান্তিতে পড়ুক—তা কোনোদিন হতে দেব না। তারপরও কোনো সময় যদি অনিচ্ছাকৃত কোনো অসুবিধা হয়ে যায়, তবে আমরা আশা করি যুদ্ধ পরিস্থিতির বিষয়টি এ দেশের মানুষ অনুধাবন করবে।’

ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের তালিকা পাঠানো হলে অবশ্যই তাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসার সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, বাংলাদেশীদের নিরাপদে ফেরার ব্যবস্থা করার জন্য গতকাল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ধন্যবাদ জানিয়ে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন। তবে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধের ব্যাপারে যে সমস্ত বিবৃতি দিয়েছে, সে ব্যাপারে আমাদের কিছু কষ্টের জায়গা আছে।

তিনি আরো বলেন, ‘যখন আমরা দেখতে পাই স্পেনের মতো অনেক ইউরোপীয় দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও জনগণের বিশাল মিছিল হচ্ছে; সেখানেও বিভিন্ন কর্মকর্তা এ যুদ্ধের সরাসরি নিন্দা জানাচ্ছেন এবং সমালোচনা করছেন। সেই হিসেবে আমরা আশা করি, বাংলাদেশ কোনো অস্পষ্ট বিবৃতি না দিয়ে এ ব্যাপারে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান নেবে। আমরা বাংলাদেশকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ভাই মনে করি, তাই আমরা চাই আমাদের সম্পর্ক আরও সুন্দর ও মসৃণ হোক। ভবিষ্যতে আমরা যেন একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারি, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। প্রকাশিত বিবৃতিগুলোতে যুদ্ধের ব্যাপারে কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ এটা স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র এখানে সরাসরি আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ আগ্রাসন নিন্দার যোগ্য এবং এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নিন্দা জানানোই আমাদের প্রত্যাশা।’

‘আমরা আরব বা মুসলিম কোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধ একেবারেই চাই না’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা এটাও বুঝি যে বাংলাদেশের কয়েক মিলিয়ন শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় আছে এবং আমরা চাই না এমন কিছু বলতে যাতে তারা অসন্তুষ্ট হয়। পাকিস্তান ও তুরস্কসহ অনেক মুসলিম দেশ আমাদের বিরুদ্ধে হামলার নিন্দা জানিয়েছে।’

জাহাজের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ছয়টি জাহাজের কথা আমাদের জানানো হয়েছে। আমরা ইরানে বিষয়টি জানিয়েছি। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল জাহাজগুলোকে সহায়তা করার অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু জাহাজগুলোর স্পেসিফিকেশন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হাতে না আসায় আমরা সেগুলো শনাক্ত করতে পারিনি। আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে জাহাজগুলোর নম্বর, জ্বালানির ধরন এবং রুটের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়েছিলাম। সেগুলো আমরা পেয়েছি এবং তা নিয়ে কাজ করছি।’

গত সপ্তাহে জাহাজের পূর্ণাঙ্গ স্পেসিফিকেশন পাওয়া গেছে জানিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এসব তথ্য ইরানে পাঠানো হয়েছে এবং কাজ চলছে। বাংলাদেশের এ জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। সম্প্রতি পেট্রলপাম্পগুলোয় জ্বালানির যে সমস্যা ও দীর্ঘ লাইন দেখা দিয়েছে, আমরা সচিত্র তথ্যের মাধ্যমে তেহরানে আমাদের ভাইদের সমস্যার কথা জানিয়েছি। এছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাতে বাংলাদেশের জনগণ যে প্রতিবাদ ও দোয়া মাহফিল করেছে, সেই সচিত্র তথ্যও আমরা পাঠিয়েছি। আমি আশা করি, জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো অতিসত্বর হরমুজ অতিক্রম করবে এবং বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের সমাধান হবে।’

যুদ্ধের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে ইরানের অসন্তোষের বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ঈদের একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। সেখানে স্বাভাবিক কথাবার্তা হয়েছে। আমি এখনো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাইনি। আমরা কোনো চিঠির মাধ্যমে এটি বলতে চাই না; সরাসরি সাক্ষাৎ হলে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে বিষয়টি জানাব।’