গত বছর ওয়াসাসহ একাধিক সংস্থার কাছ থেকে মোট ৪০টি খালের মালিকানা পায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। খালের দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই দুই মেয়র খাল নিয়ে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কাজ শুরু করেন। এরই অংশ হিসেবে খালের পাড় সংরক্ষণসহ হাঁটা ও সাইকেলের রাস্তা নির্মাণের ঘোষণা দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে এক্ষেত্রে অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণের ফলে খালের সীমা সংকুচিত হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নগরবিদরা। তেমন হলে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় হলেও জনগণ কোনো সুফল পাবে না বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
অবৈধ দখল উচ্ছেদের পাশাপাশি ঢাকার খাল নিয়ে বৃহত্তম পরিকল্পনা প্রণয়ন হচ্ছে। ঢাকার দুই সিটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঢাকার খালগুলো কেবল উদ্ধারই নয়, দুই পাড় দৃষ্টিনন্দন করারও মহাপরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ওয়াকওয়ে ও সাইকেল লেন তৈরি, মাছ ধরার শেড, বাগান, ফোয়ারা, ইকোপার্ক, পাবলিক টয়লেট ও খেলার মাঠ তৈরি, আলোকসজ্জা ব্যবস্থা ও দুই পাড় বাঁধাই করে সবুজায়নসহ আরো নান্দনিক স্থাপনা গড়ার কথা জানান তারা। তাছাড়া স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সংস্থা দুটি।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা চারটি খাল উদ্ধার করে সেগুলোকে দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তুলতে ৯৮১ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছি। প্রকল্পটি পাস হলে খাল উদ্ধার করে দুই পাড়ে বানানো হবে ওয়াকওয়ে, বাইসাইকেল লেন, মাছ ধরার শেড, বাগান, ফোয়ারা, ফুটওভার ব্রিজ, ইকোপার্ক, পাবলিক টয়লেট, খেলার মাঠ।
জানা গেছে, ডিএসসিসির কালুনগর, জিরানী, মান্ডা ও শ্যামপুর খালের জন্য প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অঞ্চল ৩-এর কালুনগর খালটি শহীদ বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে রায়েরবাজার স্লুইচ গেট পর্যন্ত বিস্তৃত। অঞ্চল ৬-এর জিরানী খালের (নন্দীপাড়া ব্রিজ ত্রিমোহনী) দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ২০ মিটার। অঞ্চল ৭-এর মান্ডা খালের দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ২ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ২৫ মিটার। অঞ্চল ১০-এর শ্যামপুর খালের দৈর্ঘ্য পাঁচ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১২ মিটার। কালুনগর খালের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭১ কোটি ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। জিরানী খালের ব্যয় ২১৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা। মান্ডা খালের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। শ্যামপুর খালের জন্য ২৩০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। কনসালট্যান্সি ফার্মের জন্য রাখা হয়েছে ১৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও প্রাথমিক পর্যায়ে চারটি অথবা আটটি খাল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। এ খালগুলোরও পাড় সংরক্ষণসহ নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে নানা অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা। তিনি বলেন, আমরা তিন ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে খাল উদ্ধার ও দূষণমুক্ত করছি। স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় পর্যায়ক্রমে সব খালের সীমা নির্ধারণ করে সেগুলোর সৌন্দর্য বাড়ানো হবে। খালের সীমা নির্ধারণের কাজটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী করবে। সীমা নির্ধারণ করেই খালের দুই পাশে সীমানা পিলার স্থাপনের কাজ শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, খালের পাশে ওয়াকওয়ে, সাইকেল লেন ও পার্কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে খালের মূল সীমানা সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, রমনা পার্কে খালের ওপরই একটি ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এসব কাজের ফলে খালের প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীর পাড়ে নির্মিত ওয়াকওয়ে এবং খালের পাড়ে নির্মিত ওয়াকওয়ের প্রকৃতি আলাদা হবে এটাই স্বাভাবিক। তাই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই খালের প্রবাহ যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিক বিবেচনা করে যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করতে হবে। খাল সংরক্ষণে নির্মিত অবকাঠামো খালের প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
খালের পাশে অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে দুই সিটিকেই হাইড্রোলজিক্যাল অ্যানালাইসিস করে কাজ করতে হবে বলে জানান নগরবিদ ইকবাল হাবিব। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, একটি খালের মৌলিক বৈশিষ্ট্য দুটি। পানি ধারণ ক্ষমতা এবং প্রবাহ বজায় রাখা। খালকে কেন্দ্র করে যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে অবশ্যই এ বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে। ওই অবকাঠামো যেন কোনোভাবেই খালের পানি ধারণ ক্ষমতা এবং প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না করে। তবে দুই সিটির খালের সীমানা নির্ধারণ করে সীমানা পিলার বসানোর কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।










