স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়েছে বাংলাদেশ। ডিসেম্বরে উদযাপিত হবে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। সরকারি উদ্যোগে যেসব কোম্পানি দেশ ও জাতি গঠনে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে সেগুলোকে নিয়ে বণিক বার্তার রোববারের বিশেষ আয়োজন 

দেশের জ্বালানি তেল সংরক্ষণ, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাত কার্যক্রম পরিচালিত হয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে। এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি খাতের তিন বিপণন কোম্পানি পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (পিওসিএল), যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (জেওসিএল) ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড (এমপিওএল)। স্বাধীনতার পর থেকে গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

স্থল, আকাশ ও জলপথে চলাচলকারী যানবাহনে জ্বালানি চাহিদা মিটিয়ে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে লাভজনক অবস্থান ধরে রেখেছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত এ তিন কোম্পানি। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ঠিক রেখে তেল মজুদ সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে কোম্পানিগুলো। এগুলোর কর্মতত্পরতার অংশ হিসেবে অত্যাধুনিক ফিলিং স্টেশন নির্মাণসহ ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু হতে যাচ্ছে। যার মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহে রাষ্ট্রীয় বিপণন খাতের এ তিন কোম্পানি আরো এগিয়ে যেতে চায়।

দেশের জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় তিন বিপণন কোম্পানির সমান অগ্রাধিকার থাকলেও শুরুটা হয়েছিল মূলত পদ্মা অয়েলের মাধ্যমে। স্বাধীনতার আগে এ অঞ্চলে পদ্মা অয়েলের নাম ছিল বার্মা অয়েল কোম্পানি। ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলে জ্বালানি তেল অনুসন্ধান-উত্তোলন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার চ্যানেল হিসেবে কাজ করত বার্মা অয়েল কোম্পানি। ১৯০৩ সালে এ অঞ্চলে কার্যক্রম শুরু করা বার্মা অয়েল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিনিয়োগকারীদের হাত ধরে চট্টগ্রামে যৌথভাবে বার্মা ইস্টার্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৭ সালে বার্মা অয়েল বিপিসির কাছে কোম্পানিটি বিক্রি করে দেয়। ১৯৮৮ সালে কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে পদ্মা নদীর নামানুসারে নামকরণ করা হয় পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড।

গত পাঁচ দশকে কোম্পানিটি বিপিসির বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের বাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। তেল মজুদাগার, ফিলিং স্টেশন, ডিস্ট্রিবিউটর, এলপিজি, মেরিন ও প্যাকড অয়েল ডিলার তৈরি করেছে। এসব প্রতিনিধির মাধ্যমে পদ্মা সারা দেশে জ্বালানি তেল বিক্রি করছে। দেশের বাজারে প্রতি বছর যে পরিমাণ জ্বালানি তেল বিক্রি হয় এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই করে পদ্মা অয়েল।

২০১৯-২০ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে তিনটি জ্বালানি তেল বিপণনকারী কোম্পানির মাধ্যমে বিপিসি মোট ৫৫ লাখ টন জ্বালানি তেল বিক্রি করেছে। এর মধ্যে ১৯ লাখ ৬৩ হাজার টন জ্বালানি তেল বিপণন করেছে পদ্মা অয়েল, যা মোট জ্বালানির ৩৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ। জ্বালানি তেল বিক্রিতে বিশেষ কৌশল অবলম্বনে কোম্পানিটি লাভজনক অবস্থান ধরে রেখেছে। সংশ্লিষ্ট অর্থবছরে কোম্পানিটি কর-পরবর্তী নিট মুনাফা করেছে ২৭২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

দেশে জ্বালানি তেল বিপণনে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন বিপণন কোম্পানির আওতায় যে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে, সেখানে পদ্মা অয়েলের এক-তৃতীয়াংশ।

বিপিসির আওতাধীন এ তিন কোম্পানির আওতায় সারা দেশে ২ হাজার ২৬০টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এছাড়া ২ হাজার ৯১৯টি এজেন্ট/ডিস্ট্রিবিউটর, ৬৬৩টি প্যাকড পয়েন্ট ডিলার, ৩ হাজার ১২৬টি এলপি গ্যাসের ডিলার ও ১১৬টি মেরিন অয়েলের ডিলার রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা অয়েলের বিপণন নেটওয়ার্ক ৬৯৭টি ফিলিং স্টেশন, ৮৫৪টি এজেন্ট/ডিস্ট্রিবিউটর, ২১৭টি প্যাকড অয়েল ডিলার, ৭৩২টি এলপি গ্যাসের ডিলার, ৫১টি মেরিন ডিলার রয়েছে।

দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহের পাশাপাশি পদ্মা অয়েল কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বালাইনাশকের বাজার তৈরি করেছে। কৃষির উন্নয়নে দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানির পাশাপাশি পদ্মা অয়েল বাজারে বালাইনাশক পণ্য বিপণন করছে। দেশে অ্যাগ্রোকেমিক্যাল পণ্যের মোট বিক্রয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৬ হাজার টন। এর মধ্যে পদ্মা অয়েল বিক্রি করেছে ২ হাজার ৮৯ টন।

দেশের তেল বিপণন খাতের আরেক কোম্পানি মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেড। গত চার দশকের বেশি সময় ধরে কোম্পানি সারা দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে আসছে। জ্বালানি তেল বিপণনে তিন কোম্পানির মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম। পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট ১৯ লাখ ৯৬ হাজার টন জ্বালানি তেল বিপণন করেছে, যা মোট বিপণনের ৩৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন কোম্পানি উল্লেখিত অর্থবছরে তিন জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা ছিল ৩০৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

১৯৭৫ সালে তদানীন্তন অ্যাসো ইস্টার্ন ইনকরপোরেশনকে অধিগ্রহণ করে সরকার। এরপর ১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। ১৯৭৬ সালের বিপিসি অধ্যাদেশে কোম্পানির সব সম্পত্তি ও দায়-দেনা বিপিসির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে।

কোম্পানির বিপণন ব্যবস্থা ও আওতাভুক্ত পেট্রল পাম্পগুলোর আধুনিকায়নের পাশাপাশি জ্বালানি তেল ব্যবস্থাপনায় গতি আনছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম। এরই মধ্যে কোম্পানিটি মডেল ফিলিং স্টেশন নির্মাণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। যেখানে গাড়িচালক থেকে শুরু করে পরিবহনের যাত্রীদের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেবা চালু করা হচ্ছে।

মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মীর ছাইফুল্লাহ-আল-খালেদ বণিক বার্তাকে বলেন, সারা দেশে জ্বালানি তেল বিপণনে মেঘনা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। যে কারণে তিন বিপণন কোম্পানির মধ্যে আমরা বিপণনে ও মুনাফায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছি। আগামীতে মেঘনা পেট্রোলিয়াম শুধু বিপণনে নয়, গ্রাহকসেবা উন্নত করতেও কাজ করবে। এর অংশ হিসেবে মেঘনার আওতাধীন মডেল ফিলিং স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। যেখানে পরিবহনগুলো সব ধরনের জ্বালানি নেয়ার সুযোগের পাশাপাশি যাত্রীদের বিশ্রাম, অত্যাধুনিক টয়লেট, রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবে। জ্বালানি তেল সংরক্ষণে মেঘনা দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বাড়াচ্ছে বলেও জানান তিনি।

দেশে জ্বালানি তেল সংরক্ষণ ও বিপণনে পদ্মা-মেঘনার পাশাপাশি পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় জ্বালানি বিপণনকারী কোম্পানি হিসেবে পাকিস্তান ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (পিএনওএল) কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশ অ্যাবানডন্ড প্রপার্টি (কন্ট্রোল, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ডিসপোজাল আদেশ অনুযায়ী পিএনওএলকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর এর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ ন্যাশনাল অয়েলস লিমিটেড। ১৯৭৩ সালে জানুয়ারিতে এক সরকারি আদেশে এর নতুন নামকরণ করা হয় যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (জেওসিএল)। ১৯৭৫ সলের ১২ মার্চ কোম্পানি আইন-১৯১৩-এর (সংশোধিত ১৯৯৪) অধীনে সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন একটি প্রাইভেট কোম্পানি হিসেবে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসে নিবন্ধিত হয়। যার অনুমোদিত মূলধন ছিল ১০ কোটি টাকা ও পরিশোধিত মূলধন ছিল ৫ কোটি টাকা।

পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালের বিপিসি অধ্যাদেশ অনুযায়ী কোম্পানির সম্পত্তি ও দায়-দেনা বিপিসির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি ইন্দোবার্মা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেডের (আইবিপিসিএল) সব সম্পত্তি ও দায়-দেনা এ কোম্পানি কর্তৃক গৃহীত হয়। এর পর থেকে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে।

বর্তমানে সারা দেশে যমুনা অয়েলের ১৬টি ডিপো রয়েছে। এছাড়াও জেওসিএলের বিদ্যমান ৭৩৫টি ডিলার, ১ হাজার ২২০টি ডিস্ট্রিবিউটর, ২৭৪টি প্যাকড পয়েন্ট ডিলার, ৭৮৮টি এলপিজি ডিলার ও ১৯টি মেরিন ডিলার দ্বারা শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্রাহকদের কাছে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সরবরাহ করে যাচ্ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তারা ১৪ লাখ ৮৮ হাজার টন জ্বালানি তেল বিক্রি করেছে, যা মোট জ্বালানি বিক্রির ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। আর্থিকভাবে লাভজনক অবস্থানে থাকা কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ২০০ কোটি ১৮ লাখ টাকা।

যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. গিয়াস উদ্দিন আনচারী বণিক বার্তাকে বলেন, বিপিসির জ্বালানি তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিগত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে যমুনা অয়েল সারা দেশে তেল বিপণন করছে। দেশে দুর্যোগ কিংবা মহামারীতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জ্বালানি তেল পৌঁছাতে বদ্ধপরিকর। শুধু তা-ই নয়, সরকার নির্ধারিত দামে বাজারে যাতে জ্বালানি তেল বিক্রি হয় সে বিষয়টিও আমরা নিশ্চিত করে যাচ্ছি। জ্বালানি তেলের মজুদ ক্ষমতা বাড়াতে আমরা প্রতি বছর স্টোরেজ সক্ষমতা বাড়াচ্ছি। এরই মধ্যে বাগেরহাটের মোংলায় এক লাখ টন মজুদ সক্ষমতাসম্পন্ন স্টোরেজ ক্যাপাসিটি তৈরি করা হচ্ছে। দেশে তেল বিপণনকারী কোম্পানি হিসেবে যমুনা যাতে লাভের ধারা অব্যাহত রাখতে পারে সেই প্রচেষ্টাও আমাদের থাকবে।

তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্ণধার হিসেবে ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। মূলত বিপিসির হয়ে কোম্পানিগুলো কাজ করে।