নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে রাজধানীর কিছু আবাসিক এলাকার প্লটের বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ ছিল। গুলশান, বনানী, বারিধারার মতো অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোর জন্য কাঠাপ্রতি ৫০ লাখ টাকা ফি দিয়ে প্লটগুলো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যেত। কিন্তু এ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় যথেচ্ছভাবে অনুমোদন দেয়া হচ্ছিল। যার প্রভাব পড়ছিল এসব এলাকার বাসিন্দাদের জীবনে। এতে যানজট যেমন বাড়ছিল, তেমনি নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা না হওয়া পর্যন্ত এসব এলাকায় প্লট বাণিজ্যিকীকরণের অনুমোদন না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাণিজ্যিকীকরণের নীতিমালা প্রণয়নের জন্য অতিরিক্ত সচিব হেমায়েত হোসেনকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে তিনি অবসরোত্তর ছুটিতে থাকায় কমিটি পুনর্গঠন করে অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনকে সভাপতি করা হয়। এরই মধ্যে একাধিক সভা করেছে কমিটি। ফলে দ্রুতই নীতিমালাটি করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বাণিজ্যিকীকরণের কার্যক্রম বন্ধ থাকার বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (রাজউক) একমত হয়েছে বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি কাজী ওয়াছি উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, কমিটির একাধিক সভা হয়েছে। আমরা ওই এলাকার বিভিন্ন তথ্য যেমন রাস্তার আয়তন, আশপাশের বাণিজ্যিক ভবনের অবস্থান, অধিবাসীর সংখ্যা এসব তথ্য সংগ্রহ করছি। সেসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমরা বাণিজ্যিকীকরণের নীতিমালাটি তৈরি করব। নগরের বৈশিষ্ট্য যাতে অক্ষুণ্ন থাকে, সে বিষয়টিও আমাদের নীতিমালার মধ্যে থাকবে। আশা করা যায় আগামী জুনের মধ্যে নীতিমালাটি চূড়ান্ত করতে পারব। সে পর্যন্ত ওই এলাকায় বাণিজ্যিক ভবন তৈরির অনুমোদন দেয়া বন্ধ থাকবে।

১৯৬১ সালে জমি অধিগ্রহণ করে গুলশানে একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। সময়ের ব্যবধানে ছায়া সুনিবিড় সেই আবাসিক এলাকাটি তার জৌলুস হারিয়েছে। আবাসিক প্লটকে বাণিজ্যিক প্লটে রূপান্তরের সুযোগে উচ্চমূল্যে বিকোচ্ছে গুলশান-বনানীর জমির দাম। সারি সারি সুউচ্চ ভবনে শপিং মল, কারখানা, রেস্টুরেন্টের ভিড়ে হারিয়েছে গুলশানের স্বকীয়তা। হারিয়ে গেছে একসময় কূটনৈতিক পাড়া বলে পরিচিতি পাওয়া আবাসিক মর্যাদাও। এখন এ এলাকায় জমির দাম কাঠাপ্রতি ৩ থেকে ৫ কোটি টাকার মধ্যে। তবে মূল সড়কের পাশে বিশেষ করে গুলশান এভিনিউয়ে এখন প্রতি কাঠা জমির দাম ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার কাছাকাছি। ১৯৭৫ সালে এখানে এক কাঠা জমির দাম ছিল ২৫ হাজার টাকা।

২০০৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে রাজউকের গুলশান, বনানী আবাসিক এলাকার গুলশান শ্যুটিং ক্লাব থেকে গুলশান ২ নম্বর চত্বর পর্যন্ত বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, গুলশান-বনানী সংযোগ ব্রিজ থেকে গুলশান-বারিধারা ব্রিজ পর্যন্ত গুলশান-মহাখালী ব্রিজ থেকে বাড্ডা লিংক রোড (গুলশান দক্ষিণ এভিনিউ) পর্যন্ত উভয় পাশের প্লটগুলো বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহারের এবং বনানী ১১ নম্বর রোডের উভয় পাশের প্লটগুলোর অ-আবাসিক ব্যবহারের অনুমোদন দেয়া হয়। তবে এসব রোডের বাইরেও গুলশান, বনানী, বারিধারা এলাকায় বিভিন্ন আবাসিক প্লটে নির্ধারিত ফি দিয়ে রাজউকের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যবহার করা হচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা অভিযোগ করে বলছেন, যথেষ্ট যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনেক সময় বিভিন্ন চাপে নত হয়ে অনৈতিকভাবে অর্থের বিনিময়ে এ ধরনের রূপান্তরের সুযোগ দেয়া হয়। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় যথেচ্ছভাবে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সুযোগ দেয়ার ফলে একটি এলাকার অধিবাসীদের বসবাসের জন্য যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন তা নষ্ট হচ্ছে।

শুরুতে গুলশান ইউনিয়ন ছিল, পরে পৌরসভায় পরিণত হয়। ১৯৭২ সালের দিকে গুলশানসহ আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত হয় গুলশান থানা। ১৯৮২ সালে গুলশান পৌরসভাকে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তখন থেকে গুলশান ঢাকা পৌরসভার একটি ওয়ার্ড হিসেবে গড়ে ওঠে। তিলে তিলে রূপ পায় আজকের গুলশান। এক সময় ঢাকার প্রধানতম বাণিজ্যিক এলাকা বলে পরিচিত ছিল মতিঝিল। অফিসপাড়া, ব্যাংকপাড়া বলতে তখন শুধু মতিঝিল ও এর আশপাশের এলাকাকেই বোঝাত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে পরিবর্তন। এখন গুলশান এবং এর আশপাশের এলাকাও বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।