বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ চিনি সরবরাহ করে চার-পাঁচটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রাজনৈতিক ও আর্থিক সংকটে দুটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যত বন্ধ। উৎপাদনে থাকা প্রধান প্রতিষ্ঠানটিও গ্যাস সংকটে সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে পারছে না। এর সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় নতুন করে অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে দেশের অন্যতম নিত্যপণ্য চিনির বাজার।

চলতি বছরের জুন-জুলাই পর্যন্ত চিনির দাম অনেকটা স্থিতিশীল ছিল। বাজেটে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে শুল্ক সুবিধা দেয়ায় দাম আরো কমার কথা থাকলেও আগস্টের শুরু থেকে বাড়তে থাকে। সর্বশেষ এক সপ্তাহে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) দাম বেড়েছে প্রায় ২০০ টাকা। ব্রাজিল ও ভারতে উৎপাদন সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দেশীয় বাজারে। এর মধ্যে এস আলম ও সিটি সুগারের উৎপাদন না থাকায় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কাও বেড়েছে।

সরকারি হিসাবে দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২০ লাখ টন, যদিও সংশ্লিষ্টদের হিসাবে তা ২২-২৩ লাখ টন। বেসরকারি খাতে এস আলম, সিটি, মেঘনা, আবদুল মোনেম ও দেশবন্ধু সুগার এ চাহিদা মেটাত। এর মধ্যে এস আলম, সিটি ও মেঘনা সরবরাহ করত ৮০-৯০ শতাংশ চিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এস আলম সুগারের উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আর্থিক সংকটে থাকা সিটি গ্রুপও জুনের পর চিনি উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।

বর্তমানে উৎপাদনে থাকা মেঘনা সুগারের দৈনিক সক্ষমতা ৫ হাজার টন। দুই প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় এর ওপর চাপ বাড়লেও গ্যাস সংকটে পূর্ণ সক্ষমতায় চিনি উৎপাদন করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। ফলে সরবরাহ ঘাটতি ও কৃত্রিম সংকটের আশঙ্কার মধ্যে অল্প সময়েই পাইকারি বাজারে চিনির দাম মণপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা বেড়েছে। বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাজার আরো অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

অন্যদিকে নানা সংকটে আবদুল মোনেম ও দেশবন্ধু সুগারের উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত। এর মধ্যে আবদুল মোনেম সুগার মিল কিনে উৎপাদনে সক্রিয় হয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপ। বেসরকারি বৃহৎ মিলগুলোর উৎপাদন কমার পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি মিল বন্ধ এবং চালু নয়টির উৎপাদনও সীমিত। সব মিলিয়ে দেশের চিনি খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ চিনি ডিলার ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে কেবল মেঘনা থেকেই চিনি পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি মিলের চিনির দাম বর্তমান বাজার থেকে বেশি হওয়ায় বিক্রি আশানুরূপ নয়। এখন বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধিসহ দেশীয় চাহিদার কারণে সরবরাহ সীমিত থাকায় দামও বাড়ছে।’ এ অবস্থায় চিনি শিল্প করপোরেশনসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমদানির পাশাপাশি ডিলারসহ ব্যবসায়ী পর্যায়ে চিনি সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে এরই মধ্যে চিনির দাম মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ১৫০-২০০ টাকা বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবার পাইকারিতে মণপ্রতি চিনি লেনদেন হয়েছে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭২০ টাকায়। তবে দিন শেষে ৩ হাজার ৭০০ টাকায় স্থির হয়।

আন্তর্জাতিক বাজারেও চিনির দাম ঊর্ধ্বমুখী। যুক্তরাষ্ট্রে ফিউচার্সের দাম পাউন্ডপ্রতি ১৭ সেন্ট ছাড়িয়েছে, যা ২০২৫ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ। এল নিনোয় উৎপাদন কমা, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতায় জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ সংকোচনের আশঙ্কায় দাম বাড়ছে। ব্রাজিল আখের বেশি অংশ ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করায় বিশ্ববাজারে চিনি সরবরাহ আরো কমার শঙ্কা রয়েছে।

দেশের দুটি বেসরকারি চিনিকলের কর্মকর্তারা জানান, উৎপাদন কমে যাওয়ায় ভারত রফতানি বন্ধের পাশাপাশি প্রায় এক দশক পর ১০ লাখ টন অপরিশোধিত চিনি শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে ক্রয়চাপ ও দাম বেড়েছে। এদিকে এস আলম ও সিটির উৎপাদন বন্ধ থাকলেও গ্যাস সংকটে মেঘনা চাহিদামতো সরবরাহ দিতে পারছে না।

বেসরকারি মিলগুলোর সংকট সামাল দেয়ার সক্ষমতা নেই রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর। বিএসএফআইসির হিসাবে, ১৫টি মিলের মধ্যে ছয়টি বন্ধ। চালু নয়টি মিল ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৮ লাখ ৩৯ হাজার টন আখ মাড়াই করে মাত্র ৪৬ হাজার ১৮৭ টন চিনি উৎপাদন করেছে। আগের মৌসুমের চেয়ে উৎপাদন বাড়লেও তা দেশের ২০ লাখ টন বার্ষিক চাহিদার মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে বেসরকারি খাতের সরবরাহ ঘাটতিতে বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা বাড়ছে।

বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশনের সচিব মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশীয় চিনি শিল্পে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর অবদান ছিল ঈর্ষণীয়। দীর্ঘদিনের পুরনো মিল দেশীয় চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন ধরে রাখতে পারেনি। কয়েক বছর ধরে ছয়টি মিলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে চিনির দাম বাড়লেও আপাতত করপোরেশনের পক্ষ থেকে চিনি আমদানি করে বাজারজাত করার পরিকল্পনা নেই। তবে নিয়মিত বিরতিতে আখের দাম বৃদ্ধি করে সরবরাহ বাড়ানো এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্ধ মিলগুলো চালু করে সরকারি মিলের চিনি উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়া হচ্ছে।’