চট্টগ্রাম শহরের যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় বন্দরের পণ্য পরিবহনকে। প্রতিদিনই বন্দরের পণ্য পরিবহন করা যানবাহন শহরটির সড়কে বাড়তি চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে বন্দর ও এর আশপাশ এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনগুলোকে যানজটের কারণে দীর্ঘ সময় রাস্তায় বসে থাকতে হয়। এর ফলে একদিকে যেমন সময় ও জ্বালানির অপচয় হয়, অন্যদিকে চালক ও যাত্রীদের স্বাস্থ্যগত সমস্যার পাশাপাশি পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর ও এর আশপাশ এলাকার যানজটের কারণে আর্থসামাজিক যে ক্ষতি হয়, বছরে তার আর্থিক পরিমাণ ১০০ কোটি টাকারও বেশি।

চট্টগ্রাম শহরের বন্দর ও এর আশপাশের শিল্প এলাকাগুলোর যানজটের আর্থসামাজিক প্রভাব বিষয়ে জানতে ২০২০ সালের নভেম্বরে শুরু হয় একটি গবেষণা কার্যক্রম। এর অংশ হিসেবে ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি—এ তিন মাস চট্টগ্রাম বন্দর ও এর আশপাশের সড়কের যানজটের তথ্য সংগ্রহ করেন গবেষক দলের সদস্যরা। মাঠ পর্যায়ের তথ্যকে বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ‘ইনসাইটস ইনটু দ্য সোশিও-ইকোনমিক ইমপ্যাক্টস অব ট্রাফিক কনজেসশন ইন দ্য পোর্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়াস অব চিটাগং সিটি, বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনটি এলসেভিয়ারের ট্রান্সপোর্টেশন জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে দেয়া তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দর ও সংলগ্ন এলাকার যানজটে প্রতিদিন আর্থসামাজিক যে ক্ষতি হয়, তার আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে ২৯ লাখ ২০ হাজার ৫৩৬ টাকা। সে হিসেবে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১০৬ কোটি ৫৯ লাখ ৯৫ হাজার ৬৪০ টাকা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) মো. জাফর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, পণ্য পরিবহনকে কেন্দ্র করে বন্দর ও এর আশপাশ এলাকায় যে যানজটের সৃষ্টি হয়, তার কারণে গাড়িচালক ও যাত্রীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। একইভাবে ব্যবসায়ীদের যেসব কারণে পরিচালন ব্যয় বাড়ে, এর অন্যতম কারণও যানজট। যাতায়াতে বিলম্বের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়, পাশাপাশি অনেক সময় যানজটে আটকে থেকে শিল্পের অনেক কাঁচামাল নষ্টও হয়ে যায়। তাই এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সড়কের ওপর চাপ কমাতে নৌ ও রেলের মাধ্যমে বন্দরের পণ্য পরিবহন বাড়াতে হবে।

যানজট ও এর আর্থিক ক্ষতি নির্ণয়ে বন্দর ও এর কাছাকাছি এলাকাগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। এলাকাগুলো হলো সিমেন্ট ক্রসিং থেকে সিইপিজেড, সিইপিজেড থেকে সল্টগোলা ক্রসিং, সল্টগোলা ক্রসিং থেকে কাস্টমস এবং কাস্টমস থেকে বারেক বিল্ডিং। আর্থিক ক্ষতি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে চারটি কারণকে বিবেচনায় নেয় গবেষক দল। এর মধ্যে রয়েছে যানজটে নষ্ট হওয়া সময়, যানবাহন চালকদের আর্থিক ক্ষতি, জ্বালানি অপচয় ও পরিবেশ দূষণের আর্থিক মূল্য।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতি হয় সিইপিজেড থেকে সল্টগোলা ক্রসিং এলাকার যানজটে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ এলাকার যানজটের বার্ষিক আর্থিক পরিমাণ ৩৫ কোটি ১১ লাখ টাকা। ক্ষতি বিবেচনায় চারটি পয়েন্টের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সল্টগোলা ক্রসিং থেকে কাস্টমস। এ এলাকার যানজটের প্রভাবে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৬১ হাজার ৬৩৫ টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা কাস্টমস থেকে বারেক বিল্ডিং এলাকার যানজটে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২০ কোটি ৮৬ লাখ ২৪ হাজার টাকা। আর সবশেষে সিমেন্ট ক্রসিং থেকে সিইপিজেড এলাকার যানজটের প্রভাবে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২০ কোটি ১ লাখ ৮ হাজার টাকা।

বন্দর এলাকায় যানজটের বিভিন্ন কারণও তুলে ধরা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে। এর মধ্যে বন্দরের গেট ও ট্রাককে যানজট সৃষ্টির সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া যানবাহনের এলোমেলো অবস্থান, চালকের আচরণ, অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত যান ও অবৈধ পার্কিংসহ বেশকিছু কারণকে যানজটের জন্য দায়ী করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-বন্দর) মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, পেশাদারত্ব বজায় রেখে বন্দর এলাকার যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। এর পরও বন্দর এলাকার কিছু পয়েন্টে যানজট হচ্ছে। এ যানজট হচ্ছে মূলত নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার ও রাস্তার কাজের জন্য। বিশেষ করে বড় দুটি প্রকল্প চলমান থাকায় রাস্তার বিভিন্ন অংশে নির্মাণসামগ্রী রয়েছে। এসব নির্মাণসামগ্রী চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তবে আশা করছি বড় নির্মাণ কাজগুলো শেষ হলে বন্দর এলাকার যানজট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তাছাড়া বন্দরে প্রবেশ ও বের হওয়ার বেশকিছু গেট রয়েছে। সেখানে মাল ওঠানামাও করানো হয়। এগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও বন্দর এলাকার যানজট নিরসন করা সম্ভব।