এসব কথা অবশ্যই দরকার। তবে তরুণদের সঙ্গে শুধু স্বপ্ন আর সম্ভাবনার কথা বললেই হবে না। তাদের সামনে যে বাস্তবতা রয়েছে, সেটি নিয়েও খোলামেলা কথা বলা দরকার।

আমি দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন খাতে কাজ করছি। আমার নিজের পথচলাও শুরু হয়েছিল তৃণমূল থেকে। তরুণদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে, বাংলাদেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন সমাজ ও মানুষের সঙ্গে মিশে একটি বিষয় বারবার শিখেছি: জীবনে সুযোগ পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সুযোগ চিনতে পারা, নিজের মূল্যবোধ ঠিক রাখা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আজকের তরুণদের পৃথিবী আমাদের সময়ের চেয়ে অনেক আলাদা। কর্মবাজার দ্রুত বদলাচ্ছে। ভালো চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র। ব্যবসা শুরু করা এবং সেটি টিকিয়ে রাখা সহজ নয়। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের পরিচিত অনেক কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে পৃথিবীর দরজাও আগের তুলনায় অনেক বেশি খোলা। উচ্চ শিক্ষা, নতুন দক্ষতা অর্জন প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সুযোগও বেড়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। তরুণরা শুধু ভবিষ্যতের শক্তি নয়, বর্তমানকেও বদলে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেই শক্তিকে কীভাবে একটি ন্যায্য, দক্ষ এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আরো কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়।

শেখার জন্য পৃথিবীকে বড় করে দেখো

শেখার সুযোগ এখন আর শুধু স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় বা নিজের দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, পৃথিবী এখন অনেকটাই উন্মুক্ত। অনলাইন কোর্স, বই, গবেষণা, পডকাস্ট, সেমিনার, ইন্টার্নশিপ, ফেলোশিপ কিংবা বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে ঘরে বসেও অনেক কিছু শেখা সম্ভব। শেখার উৎসও শুধু বই বা শ্রেণীকক্ষ নয়। মানুষের কাছ থেকে শেখো, কাজ থেকে শেখো, ভ্রমণ থেকে শেখো, নিজের ভুল থেকে শেখো। ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কথা বলো। প্রশ্ন করো, কৌতূহলী থাকো। মনে রেখো, ডিগ্রি অর্জনের সঙ্গে শেখা শেষ হয়ে যায় না।

সুযোগ থাকলে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যাও। আমি শুধু চাকরির জন্য দেশ ছেড়ে যাওয়া বা স্থায়ীভাবে অন্য দেশে বসবাসের কথা বলছি না। আমি বলছি শেখার জন্য যাওয়ার কথা। একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ডিগ্রি দেয় না—নতুন চিন্তা, গবেষণা, ভিন্ন সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা দেয়। পৃথিবীকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করে। যাও, শেখো, পৃথিবী দেখো এবং নিজের সক্ষমতা বাড়াও। তবে আমার প্রত্যাশা থাকবে, পড়াশোনা শেষে অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরে আসো। যে জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ক অর্জন করেছ, তা নিজের দেশ ও মানুষের জন্য কাজে লাগানোর সুযোগ খুঁজে নাও। আমাদের দেশের মেধাবী তরুণরা যদি পৃথিবীর সেরা জায়গাগুলো থেকে শিখে ফিরে এসে শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও সমাজে নতুন কিছু তৈরি করে, সেটিই দেশের জন্য বড় শক্তি হতে পারে।

দক্ষতা ও সুযোগ দুটোই দরকার

একটি ডিগ্রি এখন আর যথেষ্ট নয়, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কাজের ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে। তাই স্কিল, রি-স্কিল এবং আপস্কিল এখন কর্মজীবনের স্বাভাবিক অংশ। ইংরেজি ও বাংলা দুটোতেই ভালোভাবে কথা বলা ও লেখা শেখো। সুযোগ থাকলে আরেকটি আন্তর্জাতিক ভাষাও শেখো। ডিজিটাল দক্ষতা, বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং মানুষের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করো। এআইয়ের ব্যবহার করতে শেখো, কিন্তু নিজের চিন্তা ও বিচার করার ক্ষমতাকে এআইয়ের হাতে ছেড়ে দিও না।

একই সঙ্গে তরুণদের শুধু দক্ষ হতে বললেই হবে না। রাষ্ট্রকেও সুযোগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমরা তরুণদের প্রায়ই উদ্যোক্তা হতে বলি। কিন্তু অর্থায়ন কঠিন, প্রক্রিয়া জটিল, আর এর সঙ্গে যদি চাঁদাবাজি, হয়রানি বা প্রভাবশালীদের অন্যায্য সুবিধা যুক্ত থাকে, তাহলে উদ্যোক্ত গড়ে উঠবে কীভাবে কিংবা একজন ছোট উদ্যোক্তা টিকে থাকবেনই বা কীভাবে?

বর্তমান সরকার যুব কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তব ফলাফলই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাধারণ তরুণ সহজে ব্যবসা শুরু করতে পারছেন কিনা, অর্থায়ন পাচ্ছেন কিনা, গ্রামের তরুণরা একই সুযোগ পাচ্ছেন কিনা, তরুণী উদ্যোক্তারা সমান সুযোগ পাচ্ছেন কিনা এবং প্রশিক্ষণের পর বাস্তবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কিনা—সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত এগুলো।

তবে সব দায়িত্ব সরকারেরও নয়। সরকার সুযোগ তৈরি করতে পারে, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে পারে, ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে পারে। একই সঙ্গে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্যে তরুণদেরও প্রস্তুত থাকতে হয়। নিজের দক্ষতা বাড়ানো, তথ্য খোঁজা, সুযোগের জন্য চেষ্টা করা, ব্যর্থ হলে আবার শুরু করা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

জুলাইয়ের শক্তি, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ

জুলাই আমাদের দেখিয়েছে, তরুণদের কণ্ঠ কতটা শক্তিশালী হতে পারে। অন্যায়, বৈষম্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস তারা দেখিয়েছে। তবে পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়। টেকসই পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন আমাদের প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি এবং সামাজিক আচরণেও পরিবর্তন আসে। আমি চাই তরুণরা রাজনীতিতে আসুক, দেশের নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলুক, প্রশ্ন করুক এবং নেতৃত্ব দিক। তবে সেই নেতৃত্ব যেন পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি না করে। ভিন্নমত মানেই শত্রু নয়। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে অপমান করা, সহিংসতায় জড়ানো, কিংবা যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয়কে বড় করে দেখা কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ হতে পারে না। নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাইলে অন্যের মতপ্রকাশের অধিকারও রক্ষা করতে হবে। রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাইলে নিজের কাজেও জবাবদিহির চর্চা করতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে নিজের পক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও একইভাবে কথা বলার সাহস থাকতে হবে। এ মূল্যবোধ শুধু রাজনীতিতে নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও দরকার। নারীকে সমান সহকর্মী ও নাগরিক হিসেবে দেখা, পরিবারে নারী পুরুষের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়া এবং ভিন্ন মত, পরিচয় বা আর্থিক অবস্থার কারণে কাউকে ছোট না করা—এসবও নেতৃত্বের অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আমাদের নতুন সংস্কৃতি দরকার। ভিন্নমতের মানুষকে আক্রমণ করা, যাচাই না করে তথ্য ছড়ানো কিংবা দলবদ্ধভাবে কাউকে অপমান করা শক্তির পরিচয় নয়। যুক্তি দিয়ে কথা বলা, অন্যের কথা শোনা এবং ভুল হলে তা স্বীকার করার সাহসও নেতৃত্বের অংশ। জুলাই যদি তরুণদের পরিবর্তনের শক্তি দেখিয়ে থাকে, তাহলে এখন সেই শক্তিকে আরো সহনশীল, ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজে যুক্ত করাই হতে পারে পরবর্তী বড় কাজ।

নিজের পথ নিজেই বেছে নাও

সব তরুণের পথ এক হবে না, হওয়ার দরকারও নেই। কেউ উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যাবে এবং শিখে দেশে ফিরে আসবে। কেউ দেশেই পড়াশোনা করবে ও ক্যারিয়ার গড়বে। কেউ চাকরি করবে, কেউ ব্যবসা শুরু করবে, আবার কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে কারিগরি শিক্ষা বা নতুন কোনো দক্ষতাকে নিজের পথ হিসেবে বেছে নেবে। তাই পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জনপ্রিয় বক্তা কিংবা আমার এ লেখাসহ কারো কথাকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নিও না। নিজের জীবন নিয়ে নিজে ভাবো। প্রশ্ন করো, তথ্য খোঁজো, মানুষের সঙ্গে কথা বলো। শুধু সফলতার গল্প নয়, ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাও জানো। নিজের আগ্রহ, সামর্থ্য, আর্থিক ও পারিবারিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বুঝে সিদ্ধান্ত নাও। জীবনের সব সিদ্ধান্ত প্রথমবারেই সঠিক হবে, এমন নয়। ভুল হতে পারে, ব্যর্থতাও আসতে পারে। ভুল বুঝতে পারলে নতুন করে শুরু করার বা পথ বদলানোর সাহস রাখো। পথ বদলানো মানেই হেরে যাওয়া নয়; অনেক সময় সেটিই সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।

শেষ কথা

তরুণদের নিয়ে আমরা প্রায়ই বলি, তরুণরাই ভবিষ্যৎ। আমি কথাটিকে একটু ভিন্নভাবে দেখি। তরুণরা শুধু ভবিষ্যৎ নয়, তারা আজকের বাংলাদেশেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। জুলাই আমাদের তরুণদের শক্তি দেখিয়েছে। এখন সেই শক্তিকে দক্ষতা, শিক্ষা, উদ্যোগ, মূল্যবোধ এবং একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সঙ্গে যুক্ত করার সময়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সুযোগ তৈরি করা, ন্যায্য পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং তরুণদের কথা শোনা। একই সঙ্গে তরুণদেরও নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে, সুযোগ খুঁজতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে এবং নিজদের কাজ ও আচরণের দায়িত্ব নিতে হবে। আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে একজন তরুণকে এগিয়ে যেতে পরিবার, পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করতে হবে না। তার মেধা, দক্ষতা, সততা, পরিশ্রম এবং উদ্যোগই হবে তার এগিয়ে যাওয়ার শক্তি।

আন্তর্জাতিক যুব দিবসে তরুণদের প্রতি আমার কথা খুব সহজ: বড় স্বপ্ন দেখো, পৃথিবী থেকে শেখো, নিজের পথ নিজে তৈরি করো। প্রশ্ন করতে শেখো, আবার অন্যের কথাও শুনতে শেখো। সফল হও, কিন্তু সফলতার পথে নিজের মূল্যবোধ, শিকড় এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ব যেন হারিয়ে না যায়।

এএসএম রহমত উল্লাহ ভূঁইয়া: উন্নয়নকর্মী ও নৃবিজ্ঞানী