সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন টেকেরঘাট চুনাপাথর খনিজ প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ আছে ২৫ বছর।
বিসিআইসির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হলেও প্রকল্পে ব্যবহূত যন্ত্রপাতি পড়ে আছে ওই স্থানে। দীর্ঘদিন ধরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৬০ কোটির টাকার এসব যন্ত্রপাতি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব যন্ত্রাংশের বেশির ভাগই অকেজো হয়ে গেছে। এরই মধ্যে চুরি হয়েছে প্রায় ২০ কেটি টাকার যন্ত্রাংশ।
কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় বেদখল হয়ে গেছে প্রকল্পের বেশকিছু পরিমাণ জমি।
স্থানীয় প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট প্রকল্প এলাকার জমি দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ প্রকল্পে মোট ১৭৪ একর জমি রয়েছে।
ডিসি খতিয়ানে বা ১ নং খতিয়ানে অর্থাৎ খাস জমি ৪০ একর, ১২০ একর প্রস্তাবিত ও ৩৪ একর সিমেন্ট ফ্যাক্টরির রেকর্ডীয় সম্পত্তি।
চুনাপাথর খনিজ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দেশের সিমেন্টের চাহিদা পূরণ করতে ১৯৪০ সালে সুরমা নদীর তীরে ছাতকে প্রতিষ্ঠা করা হয় আসাম বেঙ্গল সিমেন্ট ফ্যাক্টরি (বর্তমানে যা ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি)। তখন ভারত থেকে চুনাপাথর আমদানি করা হতো।
নিজস্ব ব্যবস্থায় চুনাপাথর উত্তোলনের জন্য ১৯৬১ সালে ভূতত্ত্ব জরিপ চালিয়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের ভাঙ্গারঘাট ও সীমান্তবর্তী টেকেরঘাটে পাঁচটি কূপ খনিতে প্রায় ১৩ কোটি ২৫ লাখ ৫৬ হাজার ৫৩৪ টন চুনাপাথর মজুদ থাকার বিষয় নিশ্চিত হয়।
১৯৬৫-৬৬ পর্যন্ত টেকেরঘাট খনিজ প্রকল্পের ৩২৭ একর জায়গার মধ্যে চুনাপাথর খনিজ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে ৭০ দশমিক ৬৯ একর এবং ৯২ দশমিক ২৫ একর এলাকায় দুটি কোয়ারিতে প্রথম চুনাপাথর উত্তোলন কাজ শুরু করে লাভের মুখ দেখে।
এরপর একাধারে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত মাত্র ১৬ লাখ ৬৩ হাজার ৭৮৩ টন চুনাপাথর উত্তোলন করা হয়।
অভিযোগ আছে, বিসিআইসির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক সংগঠনের কিছু স্বার্থান্বেষী লোকজনের কারণে লাভের এ প্রকল্প হঠাৎ লোকসানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয় পরিকল্পিতভাবে।
পরে বিসিআইসির প্রতিষ্ঠান ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির অধীনে স্থানান্তরিত হয়।
এরপর ১৯৯৬ সালের দিকে খনিজ প্রকল্পটিকে বন্ধ করে দিলে প্রায় ৪০০ শ্রমিক-কর্মচারীকে বিসিআইসির অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করা হয়।
সর্বশেষ ২০০৭ সালের ২ অক্টোবরে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে ৩১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হলে প্রকল্পটির কার্যক্রম একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।
এখানে ৬০ কোটিরও বেশি টাকার যন্ত্রপাতি ছিল বলে চুনাপাথর খনিজ প্রকল্প এলাকার একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
বন্ধ থাকা চুনাপাথর খনিজ প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অরক্ষিত অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে প্রায় কোটি টাকা মূল্যের তিনটি ক্রেন, সাড়ে তিন কিলোমিটার ন্যারোগ্যাজ রেললাইন, ২০ লাখ টাকার স্লিপার, ৫ কোটি টাকার মূল্যের দুটি জেনারেটর, ২ কোটি টাকা মূল্যের লোকাল ট্রলি ইঞ্জিন ও পাঁচটি টিপিং টাব, বেকু হেলি, লোডার, ওয়ার্কসপ, ওয়েব্রিজসহ চুনাপাথর উত্তোলনের কাঁচামাল ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ।
এসব রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০০৭ সালের পর থেকে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা প্রকল্প ইনচার্জ (পিআই), একজন
প্লাটুন কমান্ডার (পিসি), একজন
সহকারী প্লাটুন কমান্ডার (এপিসি) ও ১৮ জন আনসার সদস্য পদায়ন করা হয়।
বর্তমানে কর্মরত ১০ জন আনসার।
এর পরও খনিজ প্রকল্পে এ পর্যন্ত ২০টির বেশি চুরির ঘটনায় প্রায় ২০ কোটি টাকার মালপত্র চুরি হয়েছে।
চুরির ঘটনায় প্রকল্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত কিছু ব্যক্তির যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়রা জানায়, বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত চুনাপাথর খনিজ প্রকল্পের বর্তমান সরকারি কোয়ার্টার প্রভাবশালীরা দখল করে ভাড়া দিয়েছেন।
দখল হয়েছে প্রকল্প এলাকার বেশির ভাগ সরকারি জমি।
দিন দিন এ দখলের পরিমাণ বাড়ছে।
কিন্তু সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের কোনো উদ্যোগ নেই।
সাবেক সিবিএ সভাপতি, তাহিরপুর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও স্থানীয় বাসিন্দা রউজ আলী বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত চুনাপাথর খনিজ প্রকল্প একসময় কর্মচঞ্চল থাকলেও এখন সুনসান।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে পড়ে থাকা সরকারি মূল্যবান সম্পদগুলো রক্ষা করা প্রয়োজন।
প্রকল্পটিতে এ পর্যন্ত প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদ চুরি হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে লিখিত অভিযোগ রয়েছে।
এ ব্যাপারে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল বারি বলেন, টেকেরঘাটে চুনাপাথর খনিজ প্রকল্পে আপাতত কোনো কিছু করার পরিকল্পনা নেই। তবে এখানে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি করার আলোচনা চলছে। প্রকল্পের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে কী পরিমাণ মালপত্র আছে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। এসব মালপত্র দেখাশোনা করার জন্য আনসার সদস্যরা আছেন। আমি নিজে দেখেছি বাইরে রাখার মালপত্রগুলো বাইরে রাখা হয়েছে। অন্যগুলো নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরেই আছে।










