কভিড-১৯ সংক্রমণের নানা সংকটের মধ্যেও চট্টগ্রামে কৃষি অঞ্চলে আউশের উৎপাদন ১০ বছরের মধ্যে ছিল সর্বোচ্চ সোয়া তিন লাখ টন। কিন্তু বছরের ব্যবধান চলতি মৌসুমে আউশের উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫০ হাজার টন। এমনকি চলতি মৌসুমে ধানটির আবাদ কম হয়েছে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৃষ্টিপাত পর্যাপ্ত না হওয়া এবং কৃষকদের অনাগ্রহের কারণে এ অঞ্চলে আউশের আবাদ কমে গেছে। যার কারণে এ অঞ্চলে আউশের উৎপাদনে বড় ধরনের ভাটা পড়েছে বলে মনে করেন তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় ২০২১-২২ অর্থবছরে স্থানীয়, উফশি এবং হাউব্রিড জাতের আউশ ধান আবাদ করা হয় ১ লাখ ৬ হাজার ৩০২ হেক্টর, যা গত মৌসুম থেকে ১৭ হাজার ৫৭৬ হেক্টর কম। সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে এরই মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ জমির আউশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। এতে আউশের উপাদন দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার ৬৯৩ টন, যা গত মৌসুম থেকে প্রায় ৫১ হাজার ১৯৩ টন কম। বাকি ১ শতাংশ জমির ধান কাটা হলেও গত বছর থেকে প্রায় ৫০ হাজার টন আউশ উৎপাদন কম হবে।

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চট্টগ্রাম জেলায় আউশ আবাদের ২৯ হাজার ৬৮৩ হেক্টর ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। এখানে ধানের উৎপাদন হয়েছে ৭৮ হাজার ৬৮৭ টন। গত বছর চট্টগ্রামে প্রায় ৩৮ হাজার হেক্টরে ১ লাখ ৮ হাজার টন ধান উৎপাদিত হয়েছিল। স্থানীয় ও হাইব্রিড ধানের উৎপাদন দুই বছরে প্রায় একই থাকলেও চলতি মৌসুমে উফশি জাতের ধানের আবাদ কম হওয়ায় চট্টগ্রামে এ ধানের আবাদে বড় ধরনের নিম্নমুখিতা দেখা গেছে।

কক্সবাজার জেলায় আউশ ধান শতভাগ কাটা সম্পন্ন হয়েছে। চলতি মৌসুমে এ জেলায় ৩ হাজার ৩২৭ হেক্টরে ধানের উৎপাদন হয়েছে ৯ হাজার ৩১৮ টন। গত বছর এ জেলায় ৩ হাজার ২৮০ হেক্টরে উৎপাদন হয় ৯ হাজার ৫১২ টন আউশ। নোয়াখালী জেলায় ৩৭ হাজার ৩২৫ হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ৮৪ হাজার ৮৩৩ টন ধান। গত বছর এ জেলায় সাড়ে ৩৯ হাজার হেক্টরে উৎপাদন হয়েছিল ৯১ হাজার ৬৫২ টন। এ জেলায় এখনো ৩৭৫ হেক্টর ধান কাটা বাকি আছে।

অন্যদিকে ফেনী জেলায় ৮ হাজার ২৯৫ হেক্টরে আউশের উৎপাদন হয়েছে ২১ হাজার ৫৩৫ টন ধান। গত অর্থবছরে এ জেলায় ৮ হাজার ৭৬৬ হেক্টরে মোট ধানের উৎপাদন ছিল ২৭ হাজার টনের বেশি। সর্বশেষ লক্ষ্মীপুর জেলায় ২৭ হাজার ৬৭০ হেক্টরে আউশের উৎপাদন হয়েছে ৭৮ হাজার ৩২০ টন ধান। তবে গত অর্থবছরে এ জেলায় ৮৮ হাজার টনের বেশি ধান উৎপাদিত হয়েছিল।

এদিকে চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এবার চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলায় জাতভেদে বেশি আবাদ হয় উফশি জাতের ধান। এ ধান আবাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত শীর্ষ পাঁচটি জাত হলো ব্রিধান-৪৮, ব্রিধান-২৭, পূর্বাচী, ব্রিধান-৫৫ ও ব্রিধান-২৮। এছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় উচ্চফলনশীল জাতের ধান ব্রিধান-৪২, ব্রিধান-৪৩, বিআর-২৬, বিআর-১, বিআর-১৪, ১৬, ২০ এবং স্থানীয় জাতের মধ্যে বৈলাম, সাইটা, হাসিকলমিসহ অন্যান্য জাতের ধানের আবাদ হয় বেশি।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. মনজুরুল হুদা বণিক বার্তাকে জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলে আউশ আবাদের সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে আবাদ কম হয়েছে। আবাদ কম হলেও হেক্টরপ্রতি ধানের উৎপাদন গত বছরের মতোই আছে। আমাদের পরিসংখ্যানের সঙ্গে কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানের জটিলতার কারণে আবাদ কম দেখানো হয়েছে। তবে যে পরিমাণ জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট। সামনের মৌসুমে যেন আউশের আবাদ বাড়ানো হয় সে বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নেব।

তবে কৃষকরা বলছেন, ধান চাষে আগের মতো লাভ নেই। আউশ মণপ্রতি যে দামে আমরা বিক্রি করি তাতে লাভ হয় না। মণে ১০০ টাকা লাভের জন্য এখন কেউ আর আউশ আবাদ করতে চান না। অন্যদিকে যারা আউশ ধানের আবাদ করছেন, তারা মূলত আউশের গাছ (খেড়) বিক্রি করে বেশি লাভবান হচ্ছেন। গরুর খাবারের এ খেড় আটিপ্রতি বরং ১০-১৮ টাকা দরে বিক্রি করি। ধানে লাভ না হলেও খেড়ে আমাদের লাভ হয়।

তবে কৃষি বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অঞ্চলে ২০১০-১১ অর্থবছরে ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি জমিতে আউশের আবাদ হয়েছিল। কিন্তু ১০ বছরের ব্যবধানে এ অঞ্চলে আউশের আবাদ কমেছে প্রায় ৬৫ হাজার হেক্টর। সরকার যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বোরোর আবাদ কমিয়ে আউশের আবাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে, সেখানে প্রতি বছর চট্টগ্রাম অঞ্চলে আউশের আবাদ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এ কারণে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাছাড়া বাজারে ধান বিক্রির সময় সঠিক দাম না পাওয়ায় আউশসহ অন্যান্য ধানের আবাদ করা কৃষকরা ছেড়ে দিচ্ছেন।