সিলেটের বালুটিকর খাল ছিল স্বচ্ছ জলের একটি প্রবহমান জলধারা। বিভিন্ন ছড়া থেকে উত্পত্তি হওয়া এ খাল বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন নাম ধারণ করে এসে মিশেছে সুরমায়। বর্তমানে শহরতলির খাদিমপাড়া এলাকায় বিসিকের শিল্পকারখানার বর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়েছে সে খালের পানি। সেই সঙ্গে দূষিত পানির দুর্গন্ধে বালুটিকরসহ আশপাশ এলাকার মানুষের জীবন এখন ওষ্ঠাগত। পানি এতটাই দূষিত যে খেতের ফসল পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। খালের পানি যেন আলকাতরার রং ধারণ করেছে।

সিলেট শহরতলির খাদিমের উত্তরাংশের খাদিম চা বাগান ও বুড়জান চা বাগানের পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা লালিছড়া খাদিম বিসিকের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সিলেট তামাবিল সড়কের মুচিয়াবাড়ি পুল হয়ে নামধারণ করেছে নীলবাড়ি ছড়া। পরে দাশপাড়া, কল্লগ্রাম, বালুটিকরসহ বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বালুটিকরের খাল নামে মাকুলি-হাকুলি বিলে গিয়ে কুশিগাঙের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। কুশিগাঙ পরে কুশিঘাট হয়ে সুরমা নদীতে মিশেছে। সেই প্রবহমান খালটি এখন দুষণে বিবর্ণ। খালের পানি ব্যবহার দূরে থাক, দুর্গন্ধে এলাকায় বসবাসও কঠিন হয়ে পড়েছে। খালপাড়ের রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করতে হয় এলাকার বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের। তাদেরকে এ দুর্গন্ধ সহ্য করেই পথ চলতে হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, জনপ্রতিনিধিরা খালের এ দুর্দশা দেখেও না দেখার ভান করছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আলকাতরার মতো কালো হয়ে আছে খালের পানি। যেখানেই পানি প্রবাহ একটু আটকা পড়ে সেখানেই সাদা ফেনার মতো আস্তরণ তৈরি হয়। বাতাস দিলে অসহনীয় দুর্গন্ধ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে অসহায়ের মতো বসবাস করছে স্থানীয় বাসিন্দারা।

খালের পানি এক সময় স্বচ্ছ কাচের মতো ছিল বলে জানিয়ে বালুটিকর গ্রামের ব্যবসায়ী রফিক মিয়া জানান, নিচে বালি, উপরে টলটলে পানি। সেখান থেকে মানুষ বালি উত্তোলন করত এবং খালের পানি খাওয়ার জন্য ব্যবহার করত। এখন পানি খাওয়া দূরে থাক ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

আব্দুর রহমান নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, একটা সময় এ খালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন কোনো জলজ প্রাণী আর এই খালে পাওয়া যাবে না।

কৃষক আরব আলী বলেন, খালের দুইপারের জমিতে ধান চাষ হতো। এখন এ খাল থেকে পানি তুলে জমিতে দিলে ধান নষ্ট হয়ে যায়। তবু বোরো খেতে মাঝে মাঝে অল্প পানি তোলেন। দুর্গন্ধ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে এজন্য প্রয়োজনমতো পানি তোলেন।

বালুটিকর খাল যেখানে হাওরে মিশেছে সেখানে হাকুলি-মাকুলি বিলে পর্যন্ত মাছ পাওয়া যাচ্ছে না জানান মো. রহম আলী। তিনি বলেন,  খালের পানি কুশিগাঙ হয়ে সুরমায় গেছে, সেখানেও মাছ নেই।

বালুটিকর খালের পানি দূষণের বিষয়টি নিয়ে বিসিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ। তিনি বলেন, কেবল আলোচনাই হয়েছিল, সমন্বয়ের অভাবে বাস্তবে সমাধানে কোনো পদক্ষেপ নেয়া যায়নি।

অন্যদিকে সিলেট বিসিকের ভারপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুহেল হাওলাদার বলেন, বিসিকের শিল্পবর্জ্যে খালের পানি দূষণের বিষয়টি তার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন জানান, এরই মধ্যে সিলেটে অনেক প্রতিষ্ঠানকে তারা ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটম্যান্ট প্লান্ট) স্থাপনে বাধ্য করেছেন। বিসিকের বিষয়টি যখন নজরে এসেছে, এক্ষেত্রেও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।