সিরাজগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে ছোট-বড় ১৬টি নদ-নদী ও ১০টি খাল প্রবাহমান। তবে পলি জমে বেশির ভাগ নদী শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। নাব্য ফিরিয়ে আনা, নৌ যোগাযোগের উন্নয়ন ও সেচ সুবিধা বাড়ানোর জন্য এসব নদী খননের উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এরই মধ্যে জেলার ২০৫ কিলোমিটার বিভিন্ন নদী খনন করা হয়েছে। কিছু কাজ চলমান রয়েছে যা জুনের মধ্যে শেষ হওয়া কথা। কাজ শেষ হলে নদীসংলগ্ন প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা ছাড়া সিরাজগঞ্জের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর মধ্যে ফুলজোর, করতোয়া, হুরাসাগর, ইছামতী, বাঙ্গালী, বড়াল অন্যতম। এক সময়ের গভীর ও খরস্রোতা নদীগুলোর বেশির ভাগ অংশ ভরাট হয়ে গেছে। বর্ষায় নদীগুলো পানিপূর্ণ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায়। এ কারণে সংকট দেখা দিয়েছে দেশীয় প্রজাতির মাছের। সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে সেচ ব্যবস্থায়।
রায়গঞ্জ উপজেলার পাঙ্গাশী গ্রামের হারান হালদার (৬৫) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইছামতী নদীতে সারা বছর পানি থাকত। নদী থেকে বোয়াল, শোল, বাউশ, গুজা, গুলশা, পুঁটি, বাইমসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে জেলে পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় দেশী প্রজাতির মাছও প্রায় বিলুপ্তির পথে। নদীতে পানিপ্রবাহ থাকলে মাছও পাওয়া যাবে। দেশী প্রজাতির মাছের উৎপাদনও বাড়বে।’
একই উপজেলার চান্দাইকোনার কৃষক আকবর আলী (৬০) বলেন, ‘সব আবাদ ছিল নদীর পানির সেচনির্ভর। এখন নদী শুকিয়ে যাওয়ায় সেচ দিতে হচ্ছে স্যালো মেশিন দিয়ে। এ কারণে চাষের খরচ বেড়েছে।’
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, নদীর তীর ভাঙন রোধ, নদী পুনরুজ্জীবিত ও নাব্য ফিরিয়ে আনা, নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভূ-উপরিস্থ সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে নদী ও খাল খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ২০৫ কিলোমিটার বিভিন্ন নদী খনন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঙ্গালী, হুরাসাগর, করতোয়া ও ফুলজোড় নদী পুনঃখনন ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ৯৪ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটি শুরু করা হয়। ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হয়। একই প্রকল্পের আওতায় ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে ১৭ কিলোমিটার করতোয়া নদী খনন করা হয়েছে। এছাড়া কাটাগাং নদীর আট কিলোমিটার খননকাজ চলছে। পাশাপাশি খনন করা হচ্ছে ফুলজোড় নদীর ২৬ কিলোমিটার, বিলসূর্য নদীর ১৪ কিলোমিটার, হুরাসাগরের ১১ কিলোমিটার ও ইছামতীর ৩৫ কিলোমিটার। চলতি বছরের জুনের মধ্যে খননকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ পওর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (পুর) মো. নাজমুল হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এরই মধ্যে জেলায় ২০৫ কিলোমিটার নদী খনন করা হয়েছে। এজন্য ব্যয় করা হচ্ছে প্রায় ২৩৪ কোটি টাকা। এখনো কিছু কাজ চলমান। খননকাজ শেষ হলে নদীর পানিপ্রবাহ ঠিক থাকবে। নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানি সেচকাজে ব্যবহার করা যাবে। এতে কমপক্ষে ৫০ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে।’
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমার বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে খনন করা নদীর বাকি অংশ ও জেলার অন্যান্য নদী এবং খাল প্রয়োজনমতো খনন করা হবে। প্রতিটি নদী ও খালের সঙ্গে সংযোগ ঘটানো হবে। ফলে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হবে এবং নদীসংলগ্ন এলাকায় বন্যার কবল থেকে ফসলি জমি ও বাড়িঘর রক্ষার পাবে। পাশাপাশি দেশী মাছের উৎপাদনও বাড়বে।’










