চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশের প্রায় ৩৬ জেলায় বয়ে যায় হিটশক বা তাপদাহ। এছাড়া শিলাবৃষ্টি আঘাত হেনেছে বেশ কয়েকটি জেলায়। হিটশক ও শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৯ হাজার হেক্টর জমির ধান। এর মধ্যে ২১ হাজার হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। সেখান থেকে এক লাখ টন চাল আসতে পারত। বাকি জমিগুলোর ধান বিভিন্ন মাত্রায় বিশেষ করে ১০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মাত্রায় ভুট্টার ক্ষতি হয়েছে। কৃষিবিদদের মতে, দেশে ফসলহানির ক্ষেত্রে এটি প্রায় নতুন ধরনের দুর্যোগ। প্রচণ্ড গতিতে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে গরম বাতাস আগে কখনো দেখা যায়নি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, ৪ এপ্রিল হাওরাঞ্চলে প্রবাহিত গরম বাতাস (লু হাওয়া) বা ‘হিটশক’ আমাদের কৃষিতে কিছুটা নতুন ধরনের অভিঘাত। দীর্ঘদিনের বৃষ্টিহীন উচ্চ তাপপ্রবাহ এ হিটশকের কারণ। এ হিটশকে নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকা এবং গোপালগঞ্জ, নড়াইল, কুষ্টিয়া, রাজশাহী ও ময়মনসিংহসহ দেশের বেশকিছু অঞ্চলে বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘ অনাবৃষ্টি ও তাপদাহের কারণে এ বছর এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। হিটশকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে হিটশকে আরো ক্ষতি হয়। ফলে হিটশকে ক্ষতির পরিমাণ ৫৫ হাজার হেক্টর ছাড়িয়েছে। হিটশকে সম্পূর্ণ ধান নষ্ট হয়েছে ১৫ হাজার হেক্টরের নিচে। ফলে আংশিক ক্ষতি হয়েছে বেশির ভাগ জমি। এছাড়া সারা দেশে বেশকিছু স্থানে শিলাবৃষ্টির কারণে ধানের ক্ষতি হয়েছে। সেখানে পাঁচ-ছয় হাজার হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আংশিক ক্ষতির পরিমাণ বেশি। তবে হিটশকে আগাম ধানে বা ধানের ফুল এসেছে এমন জমিতে বেশি ক্ষতি হয়েছে। যেসব জমির ধান ফুল ফোটা পর্যায়ে ছিল না, সেগুলোর ক্ষতি হয়নি। যেখানে ফুল ফোটা পর্যায়ে ছিল, সেটাতে প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে।

জানা গেছে, করোনাকালে নতুন এ সংকটে কৃষকের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। দেশের কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে উচ্চ তাপমাত্রা বা ‘হিটশক’। শিলাবৃষ্টি ও গরম বাতাস—এ দুই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চালের উৎপাদন কম হলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে চালের দাম কয়েক মাস ধরেই উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সরবরাহ পরিস্থিতি বাড়াতে এরই মধ্যে সরকারিভাবে চাল আমদানি করা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে প্রায় ১০ লাখ টন চাল আমদানির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়া বেসরকারিভাবে চাল আমদানি উৎসাহিত করা হচ্ছে।

ডিএই বলছে, চলতি বছর বোরো ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে হয়েছে। ফলে বোরোর আবাদ দাঁড়িয়েছে ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০ হেক্টরে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হাইব্রিড আবাদ বাড়ানো হয় প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমিতে। ফলে শিলাবৃষ্টি ও হিটশকে লক্ষ্যমাত্রা থেকে চালের উৎপাদন খুব বেশি কম হবে না। তাছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে কৃষকদের কী ধরনের সহায়তা দরকার এবং বিকল্প কীভাবে আবাদ ধরে রাখা যায়, সে বিষয়ে কাজ করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা।

এ বিষয় ডিএই মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, হিটশক নতুন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এর পাশাপাশি শিলাবৃষ্টিতে বেশ ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে এমন ধানের পরিমাণ খুব বেশি হবে না। আংশিক বা সামান্য ক্ষতির শিকার হয়েছে বেশি। তবে যতটুকুই ক্ষতি হোক না কেন আমরা কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া এ সময়ে করণীয় বিষয়ে কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে সম্প্রসারণ কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। আশা করছি, নতুন এ প্রাকৃতিক দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে পারব।

জানা গেছে, ‘হিটশক’ বা উচ্চ তাপমাত্রা থেকে ধান রক্ষায় করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে তীব্র তাপদাহের ‘হিটশক’-এর ক্ষতি থেকে ধানকে রক্ষার একমাত্র উপায় হচ্ছে ধানের জীবনকালের ওপর ভিত্তি করে বপন ও রোপণ সময় এমনভাবে সমন্বয় করা, যাতে ধানের ফুল ফোটার সময় কালবৈশাখী ও তীব্র তাপদাহ এড়িয়ে যাওয়া যায়। এ সময় বোরো ধানের যেসব জাত ফুল ফোটা পর্যায়ে আছে বা এখন ফুল ফুটছে বা সামনে ফুল ফুটবে, সেসব জমিতে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখতে হবে এবং ধানের শীষে দানা শক্ত না হওয়া পর্যন্ত জমিতে অবশ্যই ২-৩ ইঞ্চি পানি রাখতে হবে।

বোরো ধানের এ পর্যায়ে নেক ব্লাস্ট বা শীষ ব্লাস্ট রোগের ব্যাপক আক্রমণ হতে পারে। শীষ ব্লাস্ট রোগ হওয়ার পরে দমন করার সুযোগ থাকে না। তাই ধানের জমিতে রোগ হোক বা না হোক, থোড় ফেটে শীষ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একবার এবং এর পাঁচ-সাতদিন পর আরেকবার বিঘাপ্রতি (৩৩ শতাংশ) ৫৪ গ্রাম ট্রুপার ৭৫ ডব্লিউপি/ দিফা ৭৫ ডব্লিউপি/ জিল ৭৫ ডব্লিউপি অথবা ৩৩ গ্রাম নাটিভো ৭৫ ডব্লিউজি অথবা ট্রাইসাইক্লাজল/স্ট্রবিন গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় ৬৭ লিটার পানিতে ভালোভাবে মিশিয়ে শেষ বিকালে স্প্রে করতে হবে। এছাড়া খুব দ্রুত তাপসহিষ্ণু জাত সম্প্রসারণ করতে হবে। তা নাহলে আগামী মৌসুমে এ ধরনের দুর্যোগ দেখা দিলে কৃষকের আরো বেশি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর বলেন, বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বুঝতে পেরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০১৩ সাল থেকে উচ্চ তাপমাত্রাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে গবেষণা শুরু করে। উচ্চ তাপমাত্রাসহিষ্ণু এন২২ জাতের সঙ্গে বোরো মৌসুমের জনপ্রিয় আধুনিক জাত ব্রি ধান২৮-এর সংকরায়ণ করে মার্কার অ্যাসিস্টেড ব্যাকক্রসিং পদ্ধতির মাধ্যমে একটি অগ্রগামী সারি নির্বাচন করেছে। এটি মধ্যম মাত্রার উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল। এ সারিটি বর্তমানে আঞ্চলিক ফলন পরীক্ষণ পর্যায়ে রয়েছে। ফলন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য গ্রহণযোগ্য হলে অবমুক্তির উদ্যোগ নেয়া হবে। এ জাতটি ফুল ফোটা পর্যায়ে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলেও এ সারিটি আশানুরূপ ফলন দিতে পারবে। ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯-এর ব্যাকগ্রাউন্ডে আরো ১৬টি উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল সারি অগ্রগামী করা হচ্ছে।