ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে সনাতন পদ্ধতি যখন হিমশিম খাচ্ছিল, সে সময় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ট্রাফিক পুলিশের বদলে গাড়ি চলাচল ব্যবস্থা পুরোপুরি যন্ত্র নিয়ন্ত্রিত করার। এজন্য ২০১৬ সালের রাজধানীর চারটি ইন্টারসেকশনে পরীক্ষামূলকভাবে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা (আইটিএস) স্থাপন করা হয়। ব্যবস্থাটি সফল হলে পুরো ঢাকা শহরে এ পদ্ধতি চালু করার কথা রয়েছে। পরীক্ষামূলক এ ব্যবস্থা চালুর জন্য জাপান থেকে আইটিএসের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ আর ইন্টারসেকশনগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন করতে খরচ হয় প্রায় ৫২ কোটি টাকা। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর আগেই বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অকেজো হয়ে পড়েছে তিন ইন্টারসেকশনে সদ্য বসানো আইটিএস। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এসব আইটিএস ব্যবহারের উপযোগিতাও হারিয়েছে। ফলে ঢাকা মহানগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা উন্নয়নে নেয়া পরীক্ষামূলক এ প্রকল্পের সুফল নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।

মহাখালী, গুলশান-১, ফুলবাড়িয়া ও পল্টন ইন্টারসেকশনে পরীক্ষামূলকভাবে আইটিএস স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য প্রথমে ফুটপাত, ড্রেন, সড়ক বিভাজক নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়। এরপর বসানো হয় আইটিএস সিস্টেম সংবলিত ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি, সিসি ক্যামেরা ও গাড়ি শনাক্তকরণ যন্ত্র। গাড়ি শনাক্তকরণ যন্ত্র, সিসি ক্যামেরা ও সিগন্যাল বাতির জন্য স্থাপন করা হয় ভূগর্ভস্থ সংযোগ কেবল। তবে পরীক্ষামূলক অবস্থায় থাকতেই গুলশান-১ নম্বর ছাড়া বাকি সবক’টি ইন্টারসেকশনে স্থাপন ও নির্মাণ করা যন্ত্রপাতি এবং অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিটি করপোরেশন, সেতু কর্তৃপক্ষ, মেট্রোরেল, ওয়াসার মতো বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়ন কাজের কারণে এসব আইটিএস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরীক্ষামূলক আইটিএস স্থাপনের কাজ বাস্তবায়ন করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। সংস্থাটির তথ্য বলছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মহাখালী ইন্টারসেকশনের আইটিএস। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ইউটার্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সংযোগ কেবল, হ্যান্ডহোল, পিভিসি পাইপসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যায়। সবশেষ গত বছরের মার্চে মহাখালী ইন্টারসেকশন থেকে জাহাঙ্গীর গেটের দিকে রাইট টার্ন বন্ধ করে দেয় ডিএনসিসি। একই সময় স্থাপিত নিউজার্সি ব্যারিয়ার ও কে-কার্ব অপসারণের মাধ্যমে আইটিএস ব্যবহারের উপযোগিতা নষ্ট করে দেয় ডিএনসিসি। একইভাবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়নাধীন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কাজের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মহাখালী ইন্টারসেকশনের আইটিএস।

পল্টন ইন্টারসেকশনে স্থাপন করা আইটিএস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চলমান উত্তরা-মতিঝিল-কমলাপুর মেট্রোরেলের নির্মাণকাজে। গাড়ি শনাক্তকরণ যন্ত্রের সংযোগ কেবল কাটা পড়ে যায় মেট্রোরেলের কাজের জন্য। একইভাবে ঢাকা ওয়াসার কাজের জন্য বায়তুল মোকাররম মসজিদের পূর্বগেট পর্যন্ত সংযোগ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে জিরো পয়েন্ট থেকে বিজয়নগর পানির ট্যাংকের দিকে থাকা সংযোগ কেবলটি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) একটি উন্নয়ন প্রকল্প।

ডিএসসিসি ড্রেন উন্নয়নের কাজ করতে গিয়ে ফুলবাড়িয়া ইন্টারসেকশনে স্থাপিত আইটিএস ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এ তিন ইন্টারসেকশনে স্থাপন করা স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পর্কে ডিটিসিএর এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের শুরু থেকেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের উন্নয়নকাজের মাধ্যমে আইটিএসের জন্য স্থাপন করা সংযোগ কেবল, খুঁটি ও গাড়ি শনাক্তকরণ যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে মহাখালী, পল্টন ও ফুলবাড়িয়ায় স্থাপন করা আইটিএস অকেজো হয়ে পড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়ায় গুলশান ১ নম্বরের আইটিএসটি এখনো কার্যকর রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ডিটিসিএর কর্মকর্তারা।

আইটিএসের সংযোগ কেবলসহ বিভিন্ন যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ডিটিসিএর ‘ঢাকা ইন্ট্রিগ্রেটেড ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ রবিউল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকার বিভিন্ন পরিষেবা সংস্থার উন্নয়নকাজের জন্য আমাদের স্থাপন করা আইটিএসের কেবলসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। যেসব সংস্থার উন্নয়নকাজের জন্য এ ক্ষতি হয়েছে, আমরা অবশ্যই সেসব সংস্থার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

প্রসঙ্গত, জাইকার কারিগরি সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। আইটিএস স্থাপনের কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। ইন্টারসেকশনের ফুটপাত, ড্রেন, সড়ক বিভাজক নির্মাণ—মোটা দাগে অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান কাজ এগুলোই। এরপর বসানো হয় আইটিএস সিস্টেম সংবলিত ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি, সিসি ক্যামেরা ও গাড়ি শনাক্তকরণ যন্ত্র। ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজগুলো বাস্তবে সম্পন্ন হয় ২০২০ সালের শেষদিকে। এর মধ্যে বিপত্তি বাধে জাপান থেকে আমদানি করা আইটিএসের একটি সার্ভার কম্পিউটার স্থাপনের আগেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) গোডাউন থেকে চুরি হয়ে যায়। চুরির এক বছর পর ফের সার্ভার কম্পিউটার কেনার উদ্যোগ নেয় ডিটিসিএ। নতুন করে সার্ভার কিনতে খরচ হয় প্রায় আড়াই কোটি টাকা। এসব জটিলতা অবসানের পর গত বছর ঢাকার গুলশান-১ নম্বর ইন্টারসেকশনে চালু করা হয় আইটিএস। যদিও চালুর পর থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নয়, এ ইন্টারসেকশনে ট্রাফিক পুলিশের মাধ্যমে পুরনো পদ্ধতিতেই যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখনো চালু হয়নি বাকি তিন ইন্টারসেকশনের আইটিএস।