ঢাকা-১৪ আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য (এমপি) আসলামুল হক প্রতিষ্ঠিত মাইশা গ্রুপের গাবতলী ও বছিলায় নির্মাণাধীন ২১৬ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র (প্রতিটি ১০৮ মেগাওয়াট) গত এক দশকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসতে পারেনি। এ অবস্থায় কেন্দ্র দুটির চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। একটি কেন্দ্রের ব্যাংক গ্যারান্টির অর্থও নিয়ে নিয়েছে সংস্থাটি। এ অবস্থায় কেন্দ্র দুটিতে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগে বেসরকারি খাতে বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র আইপিপি প্রকল্পগুলোর নির্মাণ অগ্রগতি-সংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমান। সভাসূত্রে জানা যায়, এ বছরের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্র দুটির নির্মাণকাজের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ।
রাজধানীর গাবতলীতে ঢাকা নর্থ ইউটিলিটি কোম্পানি লিমিটেড নামে ১০৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অনুমোদন পায় ২০১১ সালে। একই বছর বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন চুক্তি সম্পন্ন করা কেন্দ্রটি ১২ মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করার কথা। বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার সময়সীমা নির্ধারণ করা ছিল ২০১২ সালের ১২ অক্টোবর। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কেন্দ্রটির ভৌত নির্মাণকাজে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এর আগে বিপিডিবির এক পর্ষদ সভায় কোম্পানিটির সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ওই নোটিস ইস্যুর অনুমোদন চেয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছিল ২০১৯ সালের ৭ মে। এরপর চলতি পঞ্জিকাবর্ষের ১৩ এপ্রিল কোম্পানিটির উদ্দেশে চুক্তি বাতিলের নোটিস জারি এবং কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় ও বাস্তবায়ন চুক্তি বাতিলের অনুমোদন চেয়ে বিদ্যুৎ বিভাগে আবারো একটি চিঠি পাঠানো হয়।
অন্যদিকে কোম্পানিটি চাইছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থান পরিবর্তন করতে। এজন্য মাইশা গ্রুপের মালিকানাধীন গাবতলীর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বছিলা, ওয়াসপুর বা কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের বিষয়ে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে একটি আবেদন করা হয়েছিল। এ বিষয়ে বিপিডিবির মতামত বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো হয় ২০১৯ সালের ১৯ জুন।
এর মধ্যেই আবার বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এ মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে মাইশা গ্রুপের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এ কারণে সময়মতো ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদও বাড়ানো হয়নি। এ অবস্থায় ব্যাংক গ্যারান্টির অর্থ নগদায়নের জন্য জনতা ব্যাংককে কয়েকবার লিখিতভাবে অনুরোধ জানায় বিপিডিবি। কিন্তু জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে এখনো গ্যারান্টির অর্থ নগদায়ন করে বিপিডিবিতে জমা দেয়া হয়নি। বর্তমানে এ অর্থ আদায়ে জনতা ব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে আইনজীবী নিয়োগ করেছে বিপিডিবি।
আসলামুল হক ২০১১ সালে ঢাকা ওয়েস্ট পাওয়ার লিমিটেড নামে কেরানীগঞ্জের বছিলায় ১০৮ মেগাওয়াটের আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন পান। একই বছর কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ ক্রয় ও বাস্তবায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এক বছরের মধ্যে নির্মাণ শেষে ২০১২ সালের ১২ অক্টোবরের মধ্যে কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার কথা। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত কেন্দ্রটির ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ। বিপিডিবি বলছে, কেন্দ্রটির জমি ভরাট ছাড়া আদতে আর কোনো অগ্রগতিই হয়নি। বিপিডিবির পর্ষদ সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে কোম্পানিটিকে চুক্তি বাতিলের নোটিস ইস্যুর অনুমোদনের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে ২০১৯ সালের ২৩ মে চিঠি পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটিকে চুক্তি বাতিলের নোটিস পাঠানো এবং কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়ন চুক্তি বাতিলের অনুমোদনের বিষয়ে এ বছরের ২৭ এপ্রিল বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে আবারো চিঠি পাঠানো হয়েছে। এদিকে কেন্দ্রটির ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ এ বছরের ২০ জানুয়ারি শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে এ অর্থ নগদায়নের জন্য ন্যাশনাল ব্যাংককে চিঠি দেয় বিপিডিবি। গত ৭ আগস্ট ব্যাংক গ্যারান্টির ৩৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা নগদায়ন করে বিপিডিবির কাছে জমা দিয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক।
ঢাকা নর্থ ইউটিলিটি কোম্পানির নামে ৩৭৮ কোটি টাকা ও ঢাকা ওয়েস্ট পাওয়ারের নামে ৭৯ কোটি টাকার ব্যাংকঋণ রয়েছে। বাস্তবায়নে মাত্র ৫ শতাংশ অগ্রগতি এবং চুক্তি বাতিলে বিপিডিবির উদ্যোগের কারণে কেন্দ্র দুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। তার ওপর ব্যাংক গ্যারান্টির অর্থ নগদায়নের উদ্যোগও নিয়েছে বিপিডিবি। এ বিষয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, আদৌ এ কেন্দ্র দুটি বাস্তবায়ন হবে কিনা, সে বিষয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কোম্পানিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় উদ্যোক্তা কেন্দ্র দুটির বাস্তবায়নে কতটুকু আন্তরিক সে বিষয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। সব মিলিয়ে আসলামুল হকের আলোচ্য এ দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
আসলামুল হকের মাইশা গ্রুপের কাছে ২০২১ সাল শেষে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৮১ কোটি টাকায়। অন্যান্য ব্যাংক মিলিয়ে ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। নির্মাণাধীন দুই বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল হয়ে গেলে খাতটি থেকে গ্রুপটি কোনো রিটার্ন পাবে না। এতে কেন্দ্র দুটির ব্যাংকঋণ আদায় হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা আরো বাড়বে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মেহমুদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, মাইশা গ্রুপের গাবতলীর বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে আমাদের বিনিয়োগ রয়েছে। গ্রুপটি আমাদের জানিয়েছে, কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে কিন্তু তহবিল সংকটের জন্য তারা এটি চালু করতে পারছে না। এ ব্যাপারে তারা আমাদের সঙ্গে একটি পরিচালন চুক্তি করার জন্য সম্প্রতি আলোচনা করেছে। আমাদের প্রত্যাশা কেন্দ্রটি চালু হলে সেখান থেকে ন্যূনতম একটা আয় হবে এবং ব্যাংকের অর্থও আদায় করা সম্ভব হবে। এছাড়া আমাদের কাছে মাইশা গ্রুপের যেসব সম্পত্তি বন্ধক রাখা আছে তার মধ্যে গাবতলীর একটি জমি প্রয়োজনবোধে বিক্রি করে গ্রুপটির ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে। ফলে আশা করছি ব্যাংকের অর্থ আদায় করা সম্ভব হবে।










