আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের ফলে সিলেট অঞ্চলে সিরামিক নির্মিত সামগ্রীর চাহিদা বেড়েছে আগের তুলনায় বহুগুণ। অঞ্চলটিতে গত দুই দশকে সিরামিক পণ্য উৎপাদনকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের কাঁচামালের দাম, মেশিনারিজ, উৎপাদন খরচ, গ্যাস সংকট ও দক্ষ জনবলের অভাবসহ নানা কারণে সিলেটে ঝুঁকির মুখে পড়েছে সম্ভাবনাময় এ শিল্প। অনেক প্রতিষ্ঠান এর আগে বিদেশে পণ্য রফতানি করলেও তা বন্ধ রয়েছে কয়েক বছর ধরে। বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠতে পারেনি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিলেট অঞ্চলে সিরামিক শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সিলেটে বেশ কয়েকটি সিরামিক নির্মিত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে সিলেট জেলায় স্থাপিত খাদিম সিরামিকস লিমিটেড অন্যতম। ১৯৯৫ সাল থেকে সিঙ্গাপুরে রফতানি হচ্ছিল খাদিম সিরামিকের পণ্য। গত দেড় বছর থেকে বিদেশে পণ্য রফতানি বন্ধ রয়েছে। কভিড-উত্তর পরিস্থিতিতে বর্তমানে টিকে থাকার লড়াই করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
সিরামিক নির্মিত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান মূলত সিলেট অঞ্চলের সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায়। এর মধ্যে অনেক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান হবিগঞ্জে কারখানা গড়ে তুলেছে। সিরামিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সিলেটের খাদিম সিরামিক, ইউরো-বাংলা সিরামিকস, হার্ড ল্যান্ড সিরামিকস; হবিগঞ্জের স্টার সিরামিক, গ্রেটওয়াল সিরামিক। এছাড়া সিলেটে নিজেদের কারখানা স্থাপন করতে যাচ্ছে এজি সিরামিক ও কনিকা সিরামিক নামে আরো সিরামিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের টাইলস, যেমন—ওয়াল টাইলস, রুফ টাইলস, ফ্লোর টাইলস, ওয়াল ডেকোরেটিভ টাইলস উৎপাদন করা হয়। এছাড়া বাথরুম ওয়্যার, টেবিল ওয়্যার ইত্যাদি পণ্যও উৎপাদন করে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো।
সম্প্রতি সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত গবেষণা করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. ফজলে এলাহী মোহাম্মদ ফয়সাল। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, এ অঞ্চলের সিরামিক শিল্পের একটি প্রধান সমস্যা হলো দক্ষ জনবলের অভাব। সিরামিক পণ্য উৎপাদনকারী কারখানাগুলোতে দক্ষ শ্রমিক জোগান দিতে রাজধানী থেকে জনবল আনতে হয়। পাশাপাশি কাঁচামালের ঘাটতিও এ শিল্পের একটি বড় সমস্যা।
তিনি জানান, বিভিন্ন পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে উৎপাদিত পণ্য রফতানি করতে অধিক সময় লেগে যায়। স্থানীয় কোনো বন্দর না থাকায় চট্টগ্রাম অথবা নারায়ণগঞ্জ থেকে কাঁচামাল পরিবহন করতে হয়, যা অঞ্চলটিতে সিরামিক পণ্যের উৎপাদন বিকাশে আরেকটি প্রতিবন্ধকতধা। শাবিপ্রবির এ অধ্যাপক বলেন, সিলেট অঞ্চলে কাচ নির্মিত তৈজসপত্র উৎপাদন করা সম্ভব। সিরামিক শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে এখানে পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ইউরো বাংলা সিরামিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মঈন উদ্দিন বলেন, ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউরো বাংলা সিরামিক মূলত বাথরুম ওয়্যার সামগ্রী উৎপাদন করছে। কিন্তু কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, দক্ষ শ্রমিকের অভাবসহ সম্প্রতি গ্যাস ৫ ঘণ্টা বন্ধের ঘোষণার পর উৎপাদন অনেকটা কমে গিয়েছে। এর ফলে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য হারে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানান এ কর্মকর্তা।
খাদিম সিরামিক লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (ফ্যাক্টরি) আব্দুর রহিম জানান, কভিড-উত্তর পরিস্থিতিতে সিলেটের সিরামিক শিল্প ব্যাপক ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে। বাজারে প্রতিষ্ঠিত বৃহৎ আকারের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন কিংবা মাঝারি কোম্পানিগুলো পেরে উঠতে পারছে না। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল ও মেশিনারিজের দাম বেড়ে যাওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এমনটা দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ যে হারে বেড়েছে, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সে হারে পণ্যের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। খাদিম সিরামিক এক সময় সিঙ্গাপুর ও কাতারে পণ্য রফতানি করত উল্লেখ করে আব্দুর রহিম বলেন, গত দেড় বছর ধরে সিরামিক পণ্য রফতানি বন্ধ রয়েছে। করোনা পরিস্থিতির জন্য হয়তো অর্ডার আসছে না।
এফবিবিসিআইয়ের পরিচালক ও সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাহমিন আহমেদ বলেন, প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে ঘরবাড়ি বানানো একটা প্রবণতা রয়েছে। এজন্য সিরামিক পণ্যের চাহিদা ব্যাপক। তিনি বলেন, সিলেটের সিরামিক পণ্য স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর বিদেশে রফতানির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তামাবিল বন্দর ব্যবহার করে ভারতের সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলে সিলেটে উৎপাদিত সিরামিক পণ্য রফতানি করা সম্ভব।
তাহমিন আহমদ বলেন, সিরামিক কারখানার ব্যবহূত বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানির জন্য কর কমানো প্রয়োজন। এছাড়া সিরামিক সামগ্রী উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় আনা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে পণ্যের গুণগত মান বাড়লে এ শিল্পে ব্যাপক লাভবান হওয়া সম্ভব বলে মন্তব্য করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।










