পুরোটাই উড়ালপথে (এলিভেটেড) নির্মিত হচ্ছে ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল। স্টেশনগুলোও উড়ালপথে। উড়ালপথ-স্টেশনের নিচে চলবে যানবাহন। স্টেশনের দুই তলায় টিকিট কাউন্টার। প্লাটফর্ম তিনতলায়। স্টেশনে ওঠানামার জন্য থাকছে সিঁড়ি, লিফট আর চলন্ত সিঁড়ি। নকশা অনুযায়ী, স্টেশনের সিঁড়ি আর লিফট হবে ফুটপাতের ওপর। ফুটপাতের প্রায় ৭০ ভাগ অংশ চলে যাবে সিঁড়ির দখলে। এই নকশায় মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ি হলে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে পথচারী চলাচল। বিষয়টিকে ‘মারাত্মক ভুল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। আপত্তি তুলেছেন উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়রও। ফুটপাতে মেট্রোর সিঁড়ি নিয়ে এখন আলোচনা হলেও এ অসংগতির সূত্রপাত ২০১১ সালে জাইকার করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে। সমীক্ষার প্রস্তাবিত নকশায় মেট্রো স্টেশনের সিঁড়িগুলো রাখা হয় ফুটপাতের ওপর, যা পরে মূল নকশায়ও অন্তর্ভুক্ত হয়।

ঢাকায় প্রথম মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য জাইকার অর্থায়নে ‘ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট স্টাডি’ সংক্ষেপে ডিএইচইউটিএস-১ নামে প্রথম সমীক্ষা করা হয়। ২০০৯-১০ সালে করা এ সমীক্ষার মাধ্যমে ঢাকার প্রথম মেট্রো নির্মাণের জন্য বেছে নেয়া হয় উত্তরা-মতিঝিল রুট। পরের বছর ডিএইচইউটিএস-২-এর মাধ্যমে করা হয় এ মেট্রোর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা। সমীক্ষার মাধ্যমে উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোর একটি ধারণাগত নকশা তৈরি করা হয়। এতে আলাদা করে স্টেশনের নকশাও করা হয়। স্টেশনের নকশা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওঠানামার সিঁড়িগুলো দেয়া হয়েছে ফুটপাতের প্রায় ৭০ ভাগ জায়গার ওপরে।

সরেজমিন মেট্রোরেলের মিরপুর-১০ নম্বর স্টেশনে গিয়ে ফুটপাতের চেয়েও খারাপ অবস্থায় দেখা গেছে। এটি মেট্রোরেলের ছয় নম্বর স্টেশন। অবস্থান ১০ নম্বর গোলচত্বরের ঠিক উত্তরে। স্টেশনটির পূর্ব পাশে উত্তর সিটি করপোরেশনের জোনাল অফিস। পূর্ব পাশে মেট্রোর স্টেশনটি এমনিতেই ফুটপাতের খানিকটা জায়গা নিয়েছে। এর মধ্যে এক জায়গায় ওঠানামার একটি সিঁড়ি কিছুটা বানিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে, যা ফুটপাতের ৮০ ভাগের বেশি জায়গা বন্ধ করে দিয়েছে। যেটুকু ফুটপাত ফাঁকা আছে, তাতে বড়জোর একজন পথচারী যেতে পারেন। দুজন চলতে গেলেই গায়ে গা লেগে যায়। এ তুলনায় পশ্চিম পাশের সিঁড়ি আর ফুটপাতের অবস্থা ভালো। সিঁড়ির কারণে পশ্চিমের ফুটপাত ব্যবহারে পথচারীদের খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না।

একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে মেট্রোরেলের পরিকল্পনা, সমীক্ষা ও নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক। ফুটপাতে মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ি রাখার বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছেন তিনি। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, জাইকার সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ফুটপাতে সিঁড়ি রেখে মেট্রো স্টেশনের নকশা করা হয়, এটা ঠিক। কিন্তু মেট্রো প্রকল্পের পরামর্শকরা শুরু থেকেই বলে এসেছেন, ফুটপাতে মেট্রোর সিঁড়ি রাখা যাবে না। তখনই জমি অধিগ্রহণ করে সিঁড়ি ও ফুটপাত আলাদা করার পরামর্শ দেন পরামর্শকরা। কিন্তু দুঃখজনক হলো কর্তৃপক্ষ বিষয়টাকে গুরুত্বই দেয়নি। উল্টো যুক্তি দেখানো হয়, ঢাকায় জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া অনেক জটিল কাজ। সেটা করতে গেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হবে।

ফুটপাতে মেট্রোর সিঁড়ি রাখার বিষয়টি মারাত্মক ভুল হিসেবে অভিহিত করে তিনি আরও বলেন, এখন কিন্তু ঠিকই সেই জটিল ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করেছেন মেট্রোরেলের হর্তাকর্তারা। কাজটি যদি শুরুতেই করা হতো, তাহলে শেষের দিকে এসে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর দরকার হতো না বলে মনে করেন তিনি।

শুধু মিরপুর-১০ নম্বর স্টেশন নয়, ফুটপাতে মেট্রোর সিঁড়ি নিয়ে জটিলতা রয়েছে পল্লবী, মিরপুর-১১, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও আগারগাঁও স্টেশনেও। এসব স্টেশনে এখন ফুটপাত থেকে মেট্রোরেলের সিঁড়ি আলাদা করতে জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।

সম্প্রতি মেট্রোরেলের মিরপুর-১০ নম্বর স্টেশন পরিদর্শনে গিয়ে ফুটপাতে মেট্রোর নির্গমন পথ রাখার বিষয়ে আপত্তি তোলেন ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম। আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়র আতিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ফুটপাত হলো পথচারীদের হাঁটার জায়গা। এ হাঁটার জায়গাটি বিঘ্নিত হয়, এমন কোনো অবকাঠামো আমরা ফুটপাতের ওপর তৈরি করতে দিতে পারি না। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো মিরপুর-১০ নম্বর, শেওড়াপাড়াসহ আরো কয়েকটি জায়গায় মেট্রোরেলের স্টেশনের সিঁড়ি নামানো হচ্ছে ফুটপাতে। ঢাকার মতো একটি জনবহুল শহরে ফুটপাতের সিংহভাগ দখল করে এ ধরনের সিঁড়ি নির্মাণ করে কোনোভাবেই কোনো ধরনের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

মেট্রোর কাজ যখন শেষের পথে, তখন ফুটপাত থেকে সিঁড়ি সরানোর দাবি করা হচ্ছে। শুরুতেই কেন সিটি করপোরেশন বিষয়টি নিয়ে আপত্তি করা হলো না—এমন প্রশ্নে ডিএনসিসি মেয়র বলেন, সিটি করপোরেশন শুরু থেকেই বলে আসছে ফুটপাতে পথচারীর চলাচল বিঘ্নিত হয়, এমন কোনো অবকাঠামো তৈরি করা যাবে না। আমরা নতুন করে কিছু বলছি না।

তবে মেয়র আতিকুলের আপত্তির বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানেন না বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সরকারের সাবেক সচিব এমএএন ছিদ্দিক। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, মেয়রের আপত্তির বিষয়টি গণমাধ্যমে জেনেছি। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আপত্তি আমরা পাইনি। যেসব বিষয়ে আপত্তি উঠেছে, সেগুলো এরই মধ্যে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

গত ২২ জানুয়ারি মেট্রোরেলের উড়ালপথ তৈরির কাজ শেষ হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সেদিন কথা বলেন এমএএন ছিদ্দিক। অনুষ্ঠানে ফুটপাতে মেট্রোর সিঁড়ি নিয়ে নকশার অসংগতির বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সাংবাদিকরা। তবে তিনি বিষয়টিকে নকশার অসংগতি কিংবা ত্রুটি হিসেবে মানতে রাজি হননি। বিভিন্ন দেশে মেট্রো নির্মাণের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেট্রোরেল বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো তৈরি হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন জটিলতায় পড়ছি ও সে অনুযায়ী সেগুলো সমাধান করছি। যেখানে মেট্রোরেলের স্টেশন থাকবে সেখানে প্রচুর মানুষের চলাফেরা হবে। কিন্তু ঢাকা শহরে বর্তমানে সড়ক পরিবহন ও সড়কের যে অবস্থা তাতে এই চাপ সামলানো সম্ভব হবে না। নগরীর সব রাস্তা প্রয়োজনীয় প্রশস্ত না থাকায় ভূমি অধিগ্রহণ করে ফুটপাতসহ সড়ক প্রশস্ত করা হবে। যাতে সড়কে যানজট সৃষ্টি না হয় এবং যাত্রীরা যাতে ভোগান্তিতে না পড়েন।