ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের বহুমাত্রিক প্রভাব ও দক্ষিণ এশিয়াসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এর কৌশলগত ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটি ওয়েবিনারের আয়োজন করেছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি)। আজ বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) অনুষ্ঠিত এ ওয়েবিনারে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অংশ নিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. জেইনাব ঘাসেমি তরি বলেন, ১৩ জুন ইরানে ইসরায়েলের বিমান হামলা কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নষ্ট করেছে ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। তার মতে, হামলায় ইরানের পারমাণবিক কাঠামো বা রাজনৈতিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও এটি দেশটির পারমাণবিক প্রতিরোধ শক্তির প্রতি জনসমর্থন বাড়িয়েছে ও অঞ্চলে সামরিকীকরণ ত্বরান্বিত করেছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো আন্তর্জাতিক নীতির রক্ষক হিসেবে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। নিয়মের বেছে বেছে প্রয়োগ বিশ্বব্যবস্থাকে অর্থহীন করে তুলেছে। মানবাধিকার কিংবা সার্বভৌমত্ব নিয়ে তাদের নৈতিকতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র গবেষক অধ্যাপক কিয়ান ফেং বলেন, এই সংঘাত চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি জানান, চীন বড় শক্তির সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে আঞ্চলিক শান্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমজাদ আব্বাস খান বলেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পাকিস্তানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অভিবাসনক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়েছে। পাকিস্তান প্রথম দেশ হিসেবে ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছে ও কূটনৈতিকভাবে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড সোশিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরোধিতা করলেও অর্থনৈতিক স্বার্থ ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে কূটনৈতিক দ্বিধার মুখে পড়েছে। একদিকে ধর্মীয় সংহতি ও জনমত, অন্যদিকে পশ্চিমা দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক—এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা একটি চ্যালেঞ্জ।

ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মহেন্দ্র লামা বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি খুবই জটিল। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে ভারতের নিজস্ব অবস্থান দুর্বল হয়েছে। তার মতে, ভারতের এখন উচিত স্বতন্ত্র কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা।

ওয়েবিনারের সমাপনী বক্তব্যে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, মুসলিম দেশগুলো ইরানের পাশে থাকবে। কারণ ইসরায়েলের আগ্রাসন আধিপত্য বিস্তারের প্রতিফলন। তিনি একটি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সেশনটি পরিচালনা করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এসআইপিজির পরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ তৌফিক এম হক। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ প্রক্সি সংঘাত থেকে সরাসরি যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক যেকোনো সংঘাতের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাবের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।