সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পরীক্ষায় এ চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে ১৬টি বিদ্যালয়ে পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক। বাকিগুলোর অনেক টিউবওয়েলেও ক্ষতিকর মাত্রা বিদ্যমান। উদ্বেগের বিষয় হলো শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা অভিভাবকরা নলকূপে আর্সেনিক উপস্থিতির বিষয়ে জানেনই না। ফলে কোমলমতি শিশুরা প্রতিনিয়ত এ পানি পান করছে। এতে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় সবচেয়ে বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে মণিরামপুর উপজেলায়, ২৬৭টি। এছাড়া সদর উপজেলায় রয়েছে ২৫১টি, অভয়নগরে ১১৭, বাঘারপাড়ায় ১০২, চৌগাছায় ১৩৯, ঝিকরগাছায় ১৩১, কেশবপুরে ১৫৮ ও শার্শা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১২৫টি। এসব বিদ্যালয়ে অবস্থিত টিউবওয়েলের পানি পরীক্ষা করে সবক’টিতেই আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে ১৬টি বিদ্যালয়ে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, খাবার পানিতে আর্সেনিকের সহনীয় বা গ্রহণযোগ্য মাত্রা হলো দশমিক শূন্য ১ মিলিগ্রাম/লিটার (বা ১০ পিপিবি)। এর চেয়ে বেশি মাত্রায় আর্সেনিক থাকলে সেই পানি পান করা স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানির বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারিভাবে দেশে পানের যোগ্য পানিতে আর্সেনিকের সহনীয় বা সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে দশমিক শূন্য ৫ মিলিগ্রাম/লিটার (বা ৫০ পিপিবি)।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর টিউবওয়েলে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয়। ফলে এসব টিউবওয়েলের পানি পান করছে কমলমতি শিক্ষার্থীরা। এতে করে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তারা।

মাত্রাতিরিক্ত দশমিক ৬২ মিলিগ্রাম আর্সেনিক মিলেছে মণিরামপুরের কাশিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আবদুস সাত্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কেউ অবহিত করেনি যে স্কুলের কলে (টিউবওয়েল) মাত্রাতিরিক্ত দশমিক ৬২ মিলিগ্রাম আর্সেনিক মিলেছে। তাহলে আমরা কলে লাল রঙ করে দিতাম। তারপরও বিষয়টি নিয়ে আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেব। আর্সেনিকযুক্ত পানি শিশুদের পান করতে দেয়া যাবে না। জেনেশুনে আমরা তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারি না।’

একই উপজেলার শ্যামকুড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিউবওয়েলে মিলেছে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক দশমিক ১০২ মিলিগ্রাম। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র বলেন, ‘আমাদের টিউবওয়েলে সবুজ রঙ করা রয়েছে। কেউ এসে আমাদের জানায়নি এ টিউবওয়েলে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। আমরা এখন ব্যবস্থা নেব। শিশুশিক্ষার্থীদের সতর্ক করব, যেন তারা ওই কলের পানি পান না করে। আমাদের বিদ্যালয়ে ডিপ টিউবওয়েল রয়েছে। শিক্ষার্থীরা সে পানি পান করে।’

শার্শা উপজেলার কায়বা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিউবয়েলে পাওয়া গেছে, দশমিক ৬৫ মিলিগ্রাম আর্সেনিক, যা ঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মোছা, সাইদুন্নেছা বলেন, ‘আমাদের স্কুলে ১৮৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। আমাদের বিদ্যালয়ে দুটি কল রয়েছে। একটি কল বাইরে অবস্থিত। সেটির পানি কেউ খায় না। ভেতরে অবস্থিত কলের পানি শিক্ষার্থী ও অন্যরা পান করে। তারপরও যদি বাইরের কলে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া যায়, সেটি আমাদের অবহিত করা প্রয়োজন ছিল। কেননা কেউ যদি ওই কলের পানি পান করে, তাহলে তার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অফিসে যোগাযোগ করব।’

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল আলিম গাজী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের নিজস্ব ল্যাবে যশোর জেলার আটটি উপজেলার ১ হাজার ২৯০টি টিউবওয়েলের পানির আর্সেনিক পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে সবক’টি টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক পাওয়া গেছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬টি। বাকি বিদ্যালয়ের টিউবওয়েলে দশমিক ৫-৬ মিলিগ্রাম আর্সেনিক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, টিউবওয়েলে দশমিক শূন্য ১ মিলিগ্রাম আর্সেনিক থাকলে সে পানি পান করা যাবে না।’

যশোর মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার মাহাবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে জানান, আর্সেনিক হলো বিষ। ন্যূনতম আর্সেনিক থাকলেও সে পানি পান করা যাবে না। সেখানে ৫ মিলিগ্রাম আর্সেনিকও শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোকে উদ্যোগী হতে হবে। কেননা নিরাপদ পানি না পান করলে শিশুদের নানা ধরনের রোগ-ব্যাধি পেয়ে বসবে।’

সচেতন নাগরিক কমিটি যশোরের সভাপতি অধ্যাপক পাভেল চৌধুরী জানান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর টিউবওয়েলে আর্সেনিক পাওয়া খুবই উদ্বেগের বিষয়। এটি দ্রুত সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলোকে অবহিত করা দরকার। না জানানো আমি মনে করি অপরাধ। না জানার কারণে স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পানি পান করছে। এতে তারা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।

এ ব্যাপারে যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) খান মাসুম বিল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেসব টিউবওয়েলে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে, সেসব টিউবওয়েলের পানি পান করা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করব।’