নেপাল, ভুটান ও সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যে পোলট্রি, মত্স্য ও পশুখাদ্যের (ফিড) হাজার কোটি টাকার রফতানির বাজার দখল নিতে চাইছেন বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা। এরই মধ্যে ভারত ও নেপালে স্বল্প পরিসরে রফতানি শুরু হয়েছে। নতুন চুক্তির কারণে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ভুটানেও।

তথ্যমতে, নেপাল, ভুটান ও সেভেন সিস্টার্সে ফিডের মোট চাহিদা রয়েছে আড়াই-তিন লাখ টন। এরই মধ্যে বাংলাদেশী দুটি প্রতিষ্ঠান ভারতে প্রায় ৪০০ টন ফিড রফতানি করেছে। শিগগিরই প্রায় ৫০০ টন রফতানি করতে যাচ্ছে আরো দুটি প্রতিষ্ঠান। নেপালেও রফতানি হয়েছে সামান্য পরিমাণে। অন্যদিকে ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সম্ভাবনার যে দুয়ার খুলে দিয়েছে, একইভাবে নেপালেও বাংলাদেশী ফিডের বাজার সম্প্রসারণ সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরের শুরুতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় প্রথম চালানে প্রায় ১০০ টন পোলট্রি ফিড রফতানির মাধ্যমে পণ্যটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যাত্রা করে ফিড বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান প্যারাগন। প্রতিষ্ঠানটি নেপালের বাজারেও কিছু পরিমাণে ফিড রফতানি করেছে। অন্যদিকে ভারতে ফিড রফতানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে কোয়ালিটি ফিড ও নারিশ। করোনার কারণে এতদিন রফতানির বাজার বন্ধ থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। আফতাব বহুমুখী ফিড কোম্পানি নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩৫০ টন মত্স্যখাদ্য রফতানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। করোনায় থমকে যাওয়া বাজারে এখন আবার গতিশীল হয়ে উঠতে চাইছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

এদিকে সম্প্রতি ভুটানের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) সম্পন্ন হয়েছে। এ চুক্তি দেশটিতে বাংলাদেশী ফিডের বাজার সম্প্রসারণের পথ খুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, একই ধরনের চুক্তি নেপালেও ফিডের রফতানি অনেকখানিই বাড়িয়ে দেবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি ও প্যারাগন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মসিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা সম্ভাবনাময় একটি বাজারে সবে প্রবেশ করলাম। দেশের ব্যবসায়ীদের এ উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও উন্নত করতে হলে সরকারের বড় ধরনের ভূমিকা প্রয়োজন। ফিড রফতানি বাজারে সবচেয়ে বড় বাধা অশুল্ক বাধা। এর মধ্যে অন্যতম হলো বন্দরগুলোর অদক্ষতা ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো। বিশেষ করে গ্রেন হ্যান্ডলিং টার্মিনাল করতে পারলে ফিডের পরিবহন খরচ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। এছাড়া প্রতিবেশী দেশের অনুমতি গ্রহণ এবং বাংলাদেশের রফতানি অনুমতি প্রক্রিয়ায়ও বেশ জটিলতা রয়েছে। এগুলো দূর করতে দূতাবাসগুলোর আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পোলট্রি ও প্রাণিখাদ্যের মাসভিত্তিক উৎপাদন এখন চার লাখ টনেরও বেশি। এর বাইরে গ্রামে বা শহরগুলোয় অনানুষ্ঠানিকভাবে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টন ফিড উৎপাদন হচ্ছে। সে হিসেবে দেশে ফিডের বার্ষিক উৎপাদন অর্ধকোটি টনেরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের বাজারে ফিডের বার্ষিক চাহিদা এক কোটি টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে ফিডের বর্তমান চাহিদা মেটাতে দেশে ভুট্টার প্রয়োজন পড়ছে প্রায় ৩১ লাখ টন। এছাড়া এজন্য সয়ামিলের চাহিদা রয়েছে প্রায় ১৪ লাখ টন। অন্যদিকে ২০৩০ সাল নাগাদ ফিড উপখাতে ভুট্টার চাহিদা বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৮ লাখ টন। সয়ামিলের প্রয়োজন দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৭ লাখ টনে। সে হিসেবে ভবিষ্যৎ অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের সক্ষমতা বজায় রেখেই রফতানি বাজার সম্প্রসারণের দিকে নজর দিতে হবে বলে অভিমত দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) উপাচার্য প্রফেসর ড. লুত্ফুল হাসান।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, প্রতিবেশী তিনটি দেশে পণ্য রফতানির সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। ভারত, নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশের ফিডের বাড়তি চাহিদার পেছনে বেশকিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে। মানসম্পন্ন ফিড সরবরাহের পাশাপাশি এসব কারণের অন্যতম হলো পণ্যের সহজপ্রাপ্যতা ও স্বল্প পরিবহন ব্যয়। ফিড রফতানির মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি সামান্য হলেও কমানো সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে রফতানির জন্য শুল্ক ও অশুল্ক সব ধরনের বাধা দূর করা প্রয়োজন। এছাড়া রফতানি বৃদ্ধিতে অবকাঠামোগত উন্নতি করতে হবে। ভারতে কারখানা করতে পারলে রফতানির সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া সম্ভব হবে। তবে দেশের বাজারে বর্তমান ও ভবিষ্যতের ফিডের চাহিদা ঠিক রাখার বিষয়ে নজর দিতে হবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের রফতানি নীতিমালা এখনো হালনাগাদ করা হয়নি। এছাড়া উপকরণ মিশ্রণ প্রক্রিয়ায়ও জটিলতা রয়েছে। বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে পারলে সামনের দিনগুলোয় প্রতিবেশী আরো কয়েকটি দেশে রফতানি বাড়ানো সম্ভব। এর মধ্যে মিয়ানমারে ভুট্টার মান এখনো যথেষ্ট উন্নত নয়। নিম্নমানের হওয়ায় দেশটি থেকে ভুট্টা বা ভুট্টাজাত ফিড সেভেন সিস্টার্সের বাজারে প্রবেশ করতে পারাটা প্রায় অসম্ভব। সেখানে বাংলাদেশের ভুট্টা ও ফিড বেশ ভালো মানের বলেই সুনাম রয়েছে। সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ফিডের স্থানীয় চাহিদা পূরণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে ভুট্টা উৎপাদনে নজর দিতে হবে। এজন্য ভুট্টার জাত উন্নয়নে গবেষণার পাশাপাশি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং রোগ প্রতিরোধ ও ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমনে টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে ভুট্টার ফল আর্মিওয়ার্ম পোকার দমন ও মোকাবেলায় কৃষককে আরো সহযোগিতা করতে হবে। এছাড়া ফিডের জৈব নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে অনেক। এর বাইরেও ফিড শিল্পে কর অবকাশ সুবিধা ছাড়াও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে।

এ বিষয়ে আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ফিআব) সাবেক সভাপতি আবু লুেফ ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, ভারতের বাজারে শুরুতে প্রবেশ করাটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। আমরা সে চ্যালেঞ্জ কিছুটা কাটাতে সক্ষম হয়েছি। দেশে ভুট্টার উৎপাদনে বিপ্লব এনেছে উন্নত মানের হাইব্রিড জাত। জিএমও পণ্য উৎপাদনে ভারতে এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে ভুট্টা উৎপাদনের বাড়তি সুবিধা নিয়ে ভারতের পাশাপাশি ভুটান ও নেপালে বাজার সম্প্রসারণ করা সম্ভব। এ তিন দেশই বাংলাদেশের ফিড রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার হতে পারে। অবকাঠামোগত সুবিধা ও রফতানিতে নগদ সহায়তা বাড়াতে পারলে রফতানি কয়েক বছরের মধ্যেই বহু গুণ বাড়ানো সম্ভব। দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সে সক্ষমতা রয়েছে। এজন্য পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন ভুট্টার সরবরাহ যেমন ঠিক রাখতে হবে, তেমনি এ খাতের কর অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানোও প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে কর অব্যাহতি সুবিধাসহ সব ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর থেকে অব্যাহতি প্রয়োজন।

বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ভুট্টার উৎপাদন ২০০৯ সালে ছিল ৭ লাখ ৫০ হাজার টন। ২০২০ সালে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ লাখ টনে। পণ্যটির বার্ষিক চাহিদা ৫৫-৬০ লাখ টন। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ ভুট্টার ফলনশীলতায় বেশ সফলতা দেখিয়েছে। হেক্টরপ্রতি ভুট্টা উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন শীর্ষ অবস্থানে। দেশে এক দশকের ব্যবধানে কৃষিপণ্যটির উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ছয় গুণ। এ সফলতার ধারাবাহিকতায়  পাঁচ বছরের মধ্যে ভুট্টার বার্ষিক উৎপাদন এক কোটি টনে উন্নীত হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক।

তিনি সম্প্রতি জানান, দেশে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদের খাদ্য হিসেবে ভুট্টা ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ভুট্টা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। দেশে ভুট্টা চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নত জাত উদ্ভাবন হয়েছে। অনুকূল কৃষি জলবায়ু রয়েছে ও কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে, যার ফলে ভুট্টার উৎপাদন বহু গুণে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।