মাসব্যাপী চলা অমর একুশে বইমেলার পর্দা নামবে আগামীকাল মঙ্গলবার (২৮ ফেব্রুয়ারি)। শেষ হবে বইপ্রেমী ও লেখক-প্রকাশকদের প্রাণের এই মেলার। কভিড-১৯ মহামারির কারণে গত দুই বছরের মন্দা কাটিয়ে অমর একুশে বইমেলা ২০২৩-এ বই বিক্রিতে রেকর্ড গড়ার প্রত্যাশা করছেন প্রকাশক ও বিক্রেতারা।
সোমবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকালে মেলাপ্রাঙ্গণে উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। মেলা শুরুর সময়েই সিকিউরিটি গেটের লাইন এসে ঠেকে প্রায় টিএসসি পর্যন্ত। বহু কষ্টে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ঢুকে দেখা যায় বিকাল সোয়া ৩টাতেই জমে উঠেছে মেলা। বিক্রয়কর্মীরা ব্যস্ত পাঠকদের চাহিদা মাফিক বই সরবরাহে। কথা হয় মেলায় আসা আয়শা রিমুর সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেখতে দেখতে মেলা শেষ হয়ে এলো। নানা ব্যস্ততায় এ বছর মেলায় আসাই হয়নি। আবার এক বছর পর মেলা। তাই ক্লাস শেষ করে শেষ করেই মেলায় চলে এলাম’। তিনি আরও বলেন, ‘মেলা শেষের দিকে হওয়ায় লোকজনের ভিড় বেশি। প্রবেশপথে বিশাল লাইন। ভেতরে ঢুকে দেখি ধূলিময় প্রান্তর। অন্তত আজকের দিনের কথা ভেবে পানি ছিটানো দরকার ছিল।’
তবে মেলায় ক্রেতার চেয়ে দর্শনার্থী বেশি
ছিল বলে জানিয়েছেন ঐতিহ্য প্রকাশনীর বিক্রেতা মোহাম্মদ মোস্তাকিম। বণিক বার্তাকে তিনি
বলেন, ‘আগামী এক বছরের জন্য মেলা শেষ হচ্ছে। অনেকে আসছেন শেষবারের মতো মেলা ঘুরে দেখতে।
যা কেনার, তা আগেই কিনেছে। তাই শেষ দুদিন (সোমবার ও মঙ্গলবার) ক্রেতার চেয়ে দর্শনার্থী
বেশি’।
এদিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় না থাকায় ও সঠিক
সময়ে মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ায় এবার বিক্রির পরিমাণ গত বছরগুলোর তুলনায় বেশি হবে বলে মনে
করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, মহামারির কারণে ২০২১ ও ২০২২ সালের মেলা পূর্ণাঙ্গভাবে
ও সঠিক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে লোকসান গুণতে হয়েছিল। আবার ঝড়-বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক
দুর্যোগের কবলেও পড়েনি এবারের মেলা। তাই গত দুই বছরের তুলনায় বিক্রির পরিমাণ বেশি হবে। সামগ্রিকভাবে বিগত যেকোনো
বছরের তুলনায় বিক্রিতে রেকর্ড সৃষ্টি হতে পারে বলে বলে তারা আশা করছেন।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালে মহামারির টালমাটাল
অবস্থায় যথাক্রমে ৩ কোটি ১১ লাখ এবং ২০২২ সালে মহামারির প্রকোপ একটু কমে আসায় ৫২ কোটি
৫০ লাখ টাকার বই বিক্রি হয়। তবে ২০২০ সালে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রায় ৮২ কোটি টাকার বই
বিক্রি হয়েছিল বলে বাংলা একাডেমি জানিয়েছিল। সে হিসেবে টাকার অঙ্কে এ বছর বিক্রির পরিমাণ
শত কোটি টাকা ছাড়াতে পারে বলে মেলা সংশ্লিষ্টরা জানান।
মঙ্গলবার সমাপনী দিনেও মেলা চলবে বিকাল
৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৫টায় সমাপনী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা ভাষণ দেবেন বাংলা
একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন ‘অমর একুশে
বইমেলা ২০২৩’-এর সদস্য-সচিব
ডা. কে এম মুজাহিদুল ইসলাম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের
প্রতিমন্ত্রী কে. এম. খালিদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের
সচিব মো. আবুল মনসুর। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ও বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক
সেলিনা হোসেন। অনুষ্ঠানে ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সাহিত্য পুরস্কার ২০২২’, ‘কবি জসীমউদ্দীন
সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩’ এবং অমর একুশে
বইমেলা ২০২৩ উপলক্ষে বিভিন্ন গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হবে।
সমাপনী অনুষ্ঠানে ২০২২ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক বই প্রকাশের জন্য ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার-২০২৩’ প্রদান করা হবে আগামী প্রকাশনীকে। এছাড়াও ২০২২ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে শৈল্পিক ও গুণমান বিচারে সেরা বই বিভাগে আহমদ রফিক রচিত ‘বিচ্ছিন্ন ভাবনা’ প্রকাশের জন্য জার্নিম্যান বুক্স পাবলিকেশন্স, মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ রচিত ‘বাংলা একাডেমি আমার বাংলা একাডেমি’ বইয়ের জন্য ঐতিহ্য প্রকাশন এবং হাবিবুর রহমান রচিত ‘ঠার: বেদে জনগোষ্ঠীর ভাষা’ প্রকাশের জন্য পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৩ প্রদান করা হবে। ২০২২ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ বইয়ের মধ্য থেকে গুণমান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য ময়ূরপঙ্খিকে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার-২০২৩’ প্রদান করা হবে। ২০২৩ সালের অমর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্য থেকে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুথিনিলয় (প্যাভিলিয়ন), নবান্ন প্রকাশনীকে (২-৪ ইউনিট) ও উড়কি (১ ইউনিট) ‘শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৩’ প্রদান করা হবে। সন্ধ্যায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকবে সমাপনী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।










