চার দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ হয়নি নড়াইলের নবগঙ্গা নদীতে সেতু নির্মাণকাজ। মাত্র ৬৫১ দশমিক ৮৩ মিটার সেতুর নির্মাণকাজ কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০১৯ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তী সময়ে আরো তিনবার সময় পেয়েও নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আগামী জুন মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অফিসের ভাষ্য অনুযায়ী কাজ শেষ হয়েছে ৬৮ শতাংশ। এলাকাবাসীর দাবি, সেতুর কাজ মাত্র অর্ধেক শেষ হয়েছে। চতুর্থ মেয়াদ শেষে নতুন করে দ্বিতীয় দফায় নকশায় পরিবর্তন এনেছে সড়ক বিভাগ। আর এ নকশা পরিবর্তনে ব্যয় বেড়েছে ২৮ কোটি টাকা। এদিকে পঞ্চম মেয়াদে আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। দীর্ঘদিনেও সেতুর নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ এ পথ দিয়ে চলাচলকারীরা।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে সড়ক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, শুরুতে নকশায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হলেও তখন নির্মাণকাজের ব্যয় বাড়েনি। নতুন করে দ্বিতীয় দফা নকশায় পরিবর্তন আনায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়
বেড়েছে। নদীতে বিভিন্ন ধরনের নৌযান চলাচল করায় বারবার আঘাত লেগে পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরই মধ্যে একটি পিলার আঘাত লেগে নদীগর্ভে চলে গেছে। সেজন্য প্রতিটি পিলারের চারদিকে স্টিলের বেষ্টনী দিয়ে বাড়তি নিরাপত্তা দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া
৯নং পিলার তুলে (বাদ) দিয়ে ৮-১০ নং পিলারের মাঝে ঢালাই না দিয়ে স্টিলের স্প্যান বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ কারণে শেষ সময় এসে দ্বিতীয় দফায় নকশা পরিবর্তন করায় ব্যয় বেড়ে গেছে।
নড়াইল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নড়াইল-কালিয়া সড়কের ২১ কিলোমিটারে নবগঙ্গা নদীর ওপর বারইপাড়া সেতু নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৫১ দশমিক ৮৩ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১০ দশমিক ২৫ মিটার প্রস্থের সেতুর কার্যাদেশ দেয়া হয়েছিল ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ। কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০১৯ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। তখন নির্ধারিত সময় পর্যন্ত মাত্র ২৩ ভাগ কাজ সম্পন্ন হওয়ায় আরো এক বছর বাড়িয়ে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেয়া হয়। ওই সময় করোনার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ না হওয়ায় চতুর্থ বার মেয়াদ বৃদ্ধি করে সড়ক বিভাগ। চতুর্থবারের সময় অনুযায়ী, আগামী জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা। তবে এবারো কাজ শেষ করতে না পারায় নতুন করে পঞ্চম মেয়াদে আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সেতুটি নির্মাণ করছেন যশোরের ঠিকাদার মো. মইনুদ্দীন বাসী ও মো. জামিল ইকবাল যৌথভাবে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নবগঙ্গা নদীর বারইপাড়া ঘাট দিয়ে অসংখ্য মানুষ প্রতিনিয়ত পারাপার হচ্ছে। একটি মোটরসাইকেল নৌকায় তুলছেন তিন-চারজনের সহযোগিতায়। সেতু নির্মাণে প্রকল্প এলাকায় ১৫-১৬ শ্রমিক কাজ করছেন। হাতেগোনা যে কয়েকজন শ্রমিক কাজ করছেন তারা নদীর পশ্চিম প্রান্তে গার্ডার ঢালাইয়ের সেন্টারিংয়ের কাজ করছিলেন। দুই পাশে সংযোগ সড়কে বালি ফেলা হলেও অন্য কোনো কাজ করা হয়নি।
স্থানীয়রা জানায়, পাঁচ-ছয় বছর আগে কাজের শুরু থেকেই সামান্য কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে প্রকল্প এলাকায় কাজ করানো হয়। মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকে কাজ। এভাবে ধীরগতিতে চলতে থাকলে এ কাজ শেষ করতে আরো অন্তত দুই বছর সময় লেগে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নড়াইলের কালিয়া উপজেলার বারইপাড়াঘাটে নবগঙ্গা নদীতে একটি সেতু না থাকায় উপজেলাটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে
রয়েছে। নদীর এক পাশে রয়েছে আটটি অপর প্রান্তে ছয়টি ইউনিয়ন। জেলা সদরের সঙ্গে কালিয়া উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা নেই। কালিয়া উপজেলাকে নড়াইল জেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে এ নদী। জেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় উপজেলাবাসীকে। এজন্য কালিয়ার বারইপাড়া ঘাটে একটি সেতু নির্মাণ এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। কালিয়া উপজেলার বাবরা গ্রামের পিকুল শেখ জানান, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বারইপাড়া ঘাট দিয়ে নদী পার হয়ে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, হাসপাতালে বিভিন্ন প্রয়োজনে যাতায়াত করে থাকেন। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় এখানে গড়ে ওঠেনি কোনো শিল্প-কলকারখানা।
ব্যবসায়ী রহমত কাজী জানান, এলাকার কৃষককে উৎপাদিত পণ্য শহরে আনতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। কালিয়া পৌরসভার মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা মুশফিকুর রহমান লিটন জানান, মারামারির ঘটনা ঘটলে থানা থেকে পুলিশ যথাসময়ে আসতে পারে না। কালিয়ায় দ্রুত পৌঁছাতে পারে না ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য অ্যামু্বলেন্স। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে সেতুর নির্মাণকাজ চলছে ধীরগতিতে। বারবার সময় পেলেও কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন ঠিকাদার।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, শুরুর দিকে সেতুর নকশা জটিলতার কারণে সেতুর নির্মাণকাজ দুই-তিন মাস বিলম্ব হয়েছে। আবারও নতুন করে নকশায় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এরই মধ্যে সেতুর মূল কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। নতুন করে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আশা করেন তিনি।
নড়াইল সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, এরই মধ্যে সেতুটির কাজ ৬৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। নতুন করে নকশায় বড় পরিবর্তন হওয়ায় ব্যয় বেড়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ডিসেম্বর ২৩ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে। নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি বলেন, আমি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট অফিসসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি দ্রুত সেতুর কাজ শেষ করার জন্য। আশা করছি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে।










