দেশের মহাসড়কগুলোর আয়ুষ্কাল ১০-২০ বছর ধরে সড়কের ওপরের অংশ নির্মাণ করা হয়। ওই আয়ুষ্কাল পাওয়ার জন্য মহাসড়কগুলোয় সর্বোচ্চ সাড়ে ১৫ টন ওজনের যানবাহন চলাচলের বাধ্যবাদকতা রয়েছে। তবে মহাসড়কগুলোয় এর চেয়ে বেশি ওজনের যানবাহন চলাচল করায় আয়ুষ্কালের আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায়। অতিরিক্ত পণ্যবাহী যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ২০২২ সালে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কে স্থাপন করা হয় ওয়ে স্কেল। তবে পরিবহন ব্যবসায়ীদের আপত্তির কারণে তিন বছরেও ওজন নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটির কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। এ অবস্থায় অতিরিক্ত পণ্য নিয়েই চলাচল করছে ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন। এতে আয়ুষ্কালের আগেই সড়ক ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিবহন ব্যবসায়ীরা বলছেন, নওয়াপাড়া, মোংলা ও ভোমরা বন্দর সড়ক বাদ রেখে কেবল বেনাপোলে স্কেল চালু হলে এ রুটে ব্যবসা কমে আসবে। এজন্য ওয়ে স্কেল ব্যবহারে আপত্তি রয়েছে তাদের। পার্শ্ববর্তী বন্দরগুলোয় স্কেল চালু হলে বেনাপোল এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনটি ব্যবহার করবেন ব্যবসায়ীরা।

এ প্রসঙ্গে বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সভাপতি আতিকুজ্জমান সনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পদ্মা নদীর এপারে বেনাপোলসহ আরো চারটি বন্দর রয়েছে। ভোমরা, নওয়াপাড়া ও মোংলা বন্দরে ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেল স্থাপন না করে বেনাপোল বন্দরসংলগ্ন সড়কে স্থাপন করে আমাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। শুধু বেনাপোলে সড়কে ওজন স্কেল চালু করা হলে ব্যবসায়ীরা বেনাপোল বন্দর ছেড়ে অন্য বন্দরে চলে যাবেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেনাপোল বন্দর। এজন্য এ স্কেল ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।’

সওজ সূত্রে জানা গেছে, সড়কপথে ভারতের সঙ্গে যে বাণিজ্য হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় তার ৮০ শতাংশ হয় বেনাপোল স্থলবন্দর ব্যবহার করে। জাপান সরকারের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার অর্থায়নে ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২২ সালে বেনাপোল পৌর গেট এলাকায় ওয়ে স্কেল স্থাপন করে সওজ বিভাগ। ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট ওয়ে স্কেল পরিচালনায় ৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা চুক্তিতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ইউডিসিকে ইজারা দেয় সরকার। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর ওয়ে স্কেলটি পুরোদমে চালু করতে অংশীজনদের নিয়ে সভা আয়োজন করে সওজ। তবে পরিবহন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের আপত্তির কারণে স্কেল উদ্বোধন না করেই ফিরে আসেন সওজ কর্মকর্তারা।

যশোর সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাহবুব হায়দার খান বলেন, ‘অন্যান্য স্থলবন্দরের চেয়ে বেনাপোলে ট্রাকে ওভারলোড সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। তবু এ বন্দরে নির্মাণ করা ওজন স্কেলটি চালু করতে ১ সেপ্টেম্বর আমরা অংশীজন সভার আয়োজন করেছিলাম। সেখানে বিভিন্ন সংগঠনের লোকজন এসে হট্টগোল বাধিয়ে সভা পণ্ড করে দেয়।’

এ প্রসঙ্গে বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেল স্থাপন করার ফলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেশী মোংলা, ভোমরা ও নওয়াপাড়া বন্দরে কোনো ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেল স্থাপন করা হয়নি। বেনাপোল সড়কের ওজন স্কেল চালু করা হলে এ বন্দর দিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব হবে না। অন্য বন্দর দিয়ে ট্রাকে পণ্য একটু কম বা বেশি হলেও কোনো সমস্যা হবে না। তাহলে কেন আমি এ বন্দর দিয়ে পণ্য এনে জরিমানা দেব? পার্শ্ববর্তী অন্য বন্দরগুলোয় ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেল চালু করা হলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।’

স্কেল পরিচালনায় নিযুক্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ইউডিসি কনস্ট্রাকশন কর্তৃপক্ষ বলছে, সড়কে পণ্য পরিবহনকারী বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা না পাওয়ায় তারা সেবা দিতে পারছেন না। এখানে ৪২ জন স্টাফ শিফট অনুযায়ী কাজ করেন। আনসার সদস্য রয়েছেন সাতজন। বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ বিল, জেনারেটর খরচসহ প্রতি মাসে পরিচালন ব্যয় প্রায় ১০ লাখ টাকা। কার্যক্রম পুরোদমে চালু না হওয়ায় বেতন-ভাতাও আটকে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘স্কেলের কার্যক্রম চালু করতে আমরা এখানে এসেছি। তবে একদিনও জরিমানা আদায় করা সম্ভব হয়নি।’

অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনে প্রথম টনে ৫ হাজার ও দ্বিতীয় টনপ্রতি ১০ হাজার টাকা জরিমানা বিধান রাখা হয়েছে। তবে স্কেলে অতিরিক্ত পণ্য শনাক্ত হলেও জরিমানা আদায় বা ওভারলোড বন্ধে কোনো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। নাভারণ হাইওয়ে পুলিশের ওসি রোকনুজ্জামান বলেন, ‘ট্রাকগুলোয় অতিরিক্ত পণ্য বহন করলেও ওজন স্লিপ না থাকায় আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারছি না। ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার কারণে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেলটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। স্কেলটি পুরোপুরি চালু করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

সার্বিক বিষয়ে যশোর সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওজন স্কেলটি পুরোদমে চালু করতে সময় লাগছে। তবে এটি চালু করতে বাধাদানকারীদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। দ্রুতই এটি চালু হবে।’