কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনকাজ চলমান থাকায় এখনো চূড়ান্তভাবে যানবাহন চলাচল শুরু হয়নি। সার্বিক নিরাপত্তার জন্য টানেলের উভয় পাশে নিরাপত্তা ফাঁড়ি নির্মাণের কথা থাকলেও পুলিশ চাইছে থানা নির্মাণ করতে। উভয় সংস্থার দ্বিমুখী অবস্থানে নিরাপত্তা ফাঁড়ির নির্মাণকাজই শুরু করতে পারেনি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। 

প্রকল্পটির কাজ শেষ পর্যায়ে আসার পর টানেলের উভয় প্রান্তে ট্রাফিক রুট নির্মাণসংক্রান্ত গঠিত কমিটির সভায় দুটি থানা নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। ২০২১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত কমিটির সভায় দুটি থানাই বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে (বিবিএ) নির্মাণের অনুরোধ করা হয়। যদিও পরে বিবিএ থানা না করে ফাঁড়ি নির্মাণের বিষয়টি পুলিশকে জানিয়ে দেয়। এর পরও টানেলের সার্বিক নিরাপত্তা ও যানবাহনের নিরাপত্তার স্বার্থে টানেলের উভয় পাশে থানা নির্মাণের আবেদন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পুলিশ বিভাগের এ আবেদন এখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

জানা গেছে, টানেলের সার্বিক নিরাপত্তায় একাধিক সংস্থা কাজ করবে। নৌ-বাহিনী, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (কেপিআই) ছাড়াও ফাঁড়ি কিংবা থানা পুলিশ নিরাপত্তা প্রদান করবে। টানেলের চট্টগ্রাম পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে পতেঙ্গা থানার দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার হলেও আনোয়ারা প্রান্ত থেকে কর্ণফুলী থানার দূরত্ব প্রায় ৯ কিলোমিটার। যার কারণে বিশেষায়িত এ অবকাঠামোর সার্বিক নিরাপত্তায় ফাঁড়ির পরিবর্তে থানা নির্মাণেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ। যদিও প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) ফাঁড়ি নির্মাণের কথা উল্লেখ রয়েছে। যার কারণে পুলিশ বিভাগের এ প্রস্তাবে রাজি হচ্ছে না সেতু কর্তৃপক্ষ। 

এদিকে উদ্বোধনের সময় ঘনিয়ে আসায় দ্রুত সময়ের মধ্যে টানেলের উভয় প্রান্তে স্বয়ংক্রিয় যানবাহন স্ক্যানার, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিসংবলিত ট্রাফিক পুলিশ চেকপোস্ট ছাড়াও আনোয়ারা প্রান্তে টোল কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবস্থা সংযোজনের অনুরোধ করেছে কেপিআই পুলিশ। ২০২২ সালের ১৫ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ছাড়াও সেতু বিভাগকে এ চিঠি দেয় কেপিআই বিশেষ পুলিশ সুপার মো. জাহিদ হোসেন ভূঞা। চিঠিতে টানেলের অভ্যন্তর দিয়ে বিস্ফোরক ও দাহ্য পদার্থ বহনকারী যানবাহন চলাচল প্রতিরোধে দ্রুত স্ক্যানার ও ট্রাফিক পুলিশ চেকপোস্ট বসানোর বিষয়ে মতামত দেয়া হয়।

বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সেতু বিভাগ। সেতু বিভাগের তথ্য বলছে, পুলিশের আশঙ্কার বিষয়টি আমলে নিয়ে এরই মধ্যে সেতু কর্তৃপক্ষ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’-এর যানবাহন চলাচলের আগেই টানেল নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) লিমিটেডের সঙ্গে অপারেশন অ্যান্ড মেনটেইন্যান্স (ওঅ্যান্ডএম) চুক্তি করা হয়। চুক্তির আওতায় যানবাহন চলাচলের আগেই সিসিসিসি টানেলের উভয় প্রান্তে অত্যাধুনিক স্ক্যানার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করবে। এছাড়া ডিপিপি অনুযায়ী টানেলের উভয় পাশে দুটি পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণের জন্য ১ দশমিক ২ একর করে মোট ২ দশমিক ৪ একর জমি রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে টানেলের পতেঙ্গা প্রান্তের জন্য ১ দশমিক ২ একর জমি নির্বাচন করে রাখা হয়েছে। তবে টানেল নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে চলে এলেও এখনো ফাঁড়ি নির্মাণের কাজ শুরু না হওয়ায় ফাঁড়ি ছাড়াই টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচল কাজ শুরু হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা সেতু কর্তৃপক্ষের। 

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশীদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌টানেল নির্মাণ প্রকল্পের ডিপিপিতে যা লেখা আছে সে অনুযায়ী নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। টানেল নির্মাণকাজের প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। উভয় পাশে ফাঁড়ি নির্মাণের জন্য জমিও রাখা হয়েছে। শিগগিরই টানেলের পতেঙ্গা ও আনোয়ারা প্রান্তে নিরাপত্তা চেকপোস্টসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হবে।’ 

যদিও সেতু কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়ে ভিন্ন মত দিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি-এস্টেট) এসএম মোস্তাইন হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌টানেল একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। টানেলের উভয় পাশেই সরকারি-বেসরকারি বৃহৎ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। বিমানবন্দর, নেভাল একাডেমি ছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দর, সরকারি-বেসরকারি ভারী শিল্প-কারখানা। যার কারণে টানেলের সার্বিক নিরাপত্তায় থানা নির্মাণ ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমরা সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে বিষয়টি জানিয়েছি। এটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিবেচনায় আছে। অনুমোদন পেলে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত জমিতেই টানেলের নিরাপত্তায় দুটি থানা নির্মাণ কাজ শুরু হবে।’ 

তবে টানেল নির্মাণ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সেতু কর্তৃপক্ষের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌টানেল নির্মাণ প্রকল্পের মধ্যেই উভয় পাশে ফাঁড়ি নির্মাণের কথা রয়েছে। এজন্য উভয় পাশেই জমি বরাদ্দ দেয়া আছে। কিন্তু পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে থানা নির্মাণের প্রস্তাব দেয়া হলেও সেটি নাকচ করে দেয়া হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে যদি থানা নির্মাণ করতেই হয় তবে সেটি পুলিশ বিভাগ নিজ খরচেই করবে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ফাঁড়ির সুবিধা-সংবলিত অবকাঠামো নির্মাণ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করবে।’ 

জানা গেছে, ট্রাফিক নির্ধারণসংক্রান্ত কমিটি এরই মধ্যে টানেলের উভয় পাশে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাফিক অফিস, ডাম্পিং স্টেশন, রেকার, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের অফিসসহ চেকপোস্ট ও থানা নির্মাণের প্রস্তাব করেছে। কিন্তু উভয় প্রান্তে মাত্র ২ দশমিক ৪ একর জমিতে এতগুলো অবকাঠামো স্থাপন সম্ভব নয় বলে মনে করছে পুলিশ। মূলত টানেল নির্মাণ প্রকল্পের সময় উভয় পাশে পর্যাপ্ত ভূমি অধিগ্রহণ না করায় নিরাপত্তাসংক্রান্ত অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে সেতু কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের মধ্যে মতানৈক্য বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা ও মেয়াদ ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি একনেকে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী পাস হয়। নতুন মেয়াদে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ হাজার ৩৩ টাকা।

টানেলটির মোট দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার, ভায়াডাক্ট ৭২৭ মিটার এবং সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার। প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৯৭ শতাংশ। এর মধ্যে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৮২ দশমিক ৬২ শতাংশ বা ৮ হাজার ৮৩১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।