নড়াইলের লোহাগড়া সরকারি আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের খেলার মাঠটি গত আট মাস  পানির নিচে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে এটি বড় কোনো ডোবা বা পুকুর। স্থানীয়রা জানান, গত এক দশক বছরের আট মাস পানিতে ভাসে মাঠটি। এতে কলেজের প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী ছাড়াও উপজেলা সদর ও আশপাশের অন্তত ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা বন্ধ রয়েছে। এছাড়া নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও বন্ধ রয়েছে।

স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছর মে মাস থেকে পরের বছর মার্চ পর্যন্ত জলাবদ্ধ থাকে মাঠটি। ২০১২ সাল থেকে এ অবস্থা। বিশাল এ খেলার মাঠটি লোহাগড়া উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। লোহাগড়া সরকারি আদর্শ মহাবিদ্যালয় ছাড়াও লোহাগড়া সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়, লোহাগড়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, মিতালী মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়, মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ উপজেলা সদর ও আশপাশের অন্তত ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ওই মাঠ ব্যবহার করত। সব ধরনের খেলাধুলা হতো মাঠটিতে। হতো নানা খেলাধুলার প্রতিযোগিতা। এছাড়া নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো ওই মাঠে। শিক্ষা বিভাগের জাতীয় পর্যায়ের বাছাই পর্বের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হতো এ মাঠে। শরীর চর্চা করতে উপজেলা সদর ও আশপাশের লোকজন ওই মাঠ ব্যবহার করত। বিকাল-সন্ধ্যায় উন্মুক্ত বাতাসে বসে শিশু-কিশোর, যুব-বৃদ্ধদের গল্প-আড্ডার আসর বসত এখানে। কিন্তু গত ১০ বছর মাঠটি বছরের প্রায় আট মাস জলাবদ্ধ থাকায় সবাই পড়েছেন বিপাকে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশাল মাঠের অর্ধেকের বেশি জায়গাজুড়ে পানি থইথই করছে। মাঠজুড়ে কচুরিপানা ও ঘাসের ঝোঁপ। হাঁস সাঁতার কাটছে সেখানে। দেখে মনে হয় কোনো বড় আকৃতির ডোবা পুকুর। সেখানে ফেলা হয়েছে ময়লা-আবর্জনা ও আশপাশের ক্লিনিকের বর্জ্য। পানির সঙ্গে সেগুলো মিশে পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কলেজের দক্ষিণ পাশে মাঠটি অবস্থিত। মাঠের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে চলাচলের সড়ক এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাশে বাড়িঘর। ফলে বৃষ্টির পানি বের হওয়ার পথ নেই কোনো পাশ দিয়েই।

স্থানীয়রা জানায়, সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। মাঠের পানি নিষ্কাশনের চারটি কালভার্ট ছিল। অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে ওঠায় কালভার্টগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে এ জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব বলে মন্তব্য তাদের। মাঠের দক্ষিণ পাশের বাসিন্দা নুসরাত অ্যানি বলেন, গত মে মাস থেকে এ পর্যন্ত পানির নিচে রয়েছে মাঠটি। মার্চ পর্যন্ত পানি থাকবে।  ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করতে পারে না। মাঠের পচা দুর্গন্ধে বাড়িতেও থাকা দায়। মশার উপদ্রবও বেড়েছে। লোহাগড়া কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী বিপ্লব মোল্লা বলেন, কলেজে খেলাধুলার জায়গা নেই। তাই শিক্ষার্থীরা বিকালে ভিন্নভাবে সময় কাটায়। আরেক শিক্ষার্থী রত্না বলেন, ঈদ-পূজা-পার্বণে বন্ধুরা মিলে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতাম এ মাঠে। কয়েক বছর তা করতে পারছি না।

লোহাগড়া পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ক্রীড়াশিক্ষক দিলীপ চক্রবর্তী বলেন, লোহাগড়ার কয়েক হাজার ছেলেমেয়ের প্রিয় খেলার মাঠ এটি। আমাদের বিদ্যালয় জাতীয় শীতকালীন অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় টানা ১০বার দেশসেরা হয়েছে। এর প্রশিক্ষণ সকাল-বিকাল এ মাঠেই হতো। কিন্তু এতদিন জলাবদ্ধ থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছি। দ্রুত খেলার মাঠটি ছেলেমেয়েদের খেলার উপযোগী করার দাবি করেন তিনি।

লোহাগড়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের  কাউন্সিলর মো. আনিচুর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নগর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় একটি বরাদ্দ হচ্ছে। সেটি দিয়ে মাঠের দক্ষিণ পাশ থেকে একটি ড্রেন লোহাগড়া বাজার হয়ে নবগঙ্গা নদীতে নামবে। পৌরসভা এটি বাস্তবায়ন করবে। এতে মাঠের জলাবদ্ধতা দূর হবে।

কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সব মহলে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আশা করছি, সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজার আন্তরিক চেষ্টায় দ্রুত খেলার মাঠের জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে দূর হবে।