চলতি বছর ভরা বৈশাখে হচ্ছে ঈদ আয়োজন। তাই নৌপথের যাত্রীদের জন্য শঙ্কার কালো মেঘের নাম কালবৈশাখী। নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দুই বছর উৎসব-পার্বণ ছিল অনেকটাই সাদামাটা। এবার পরিপূর্ণ ঈদ পালনের প্রস্তুতি সবখানে। কিন্তু প্রতি বছরই ঈদ আনন্দ মলিন করে দেয় বিভিন্ন রকম দুর্ঘটনা। একই অবস্থা নৌপথেও। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগেভাগে সতর্ক হলে বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই এড়ানো যায়। এরই মধ্যে নৌপথগুলোয় ফিট নৌযানের পাশাপাশি আনফিট নৌযান চলাচল শুরু হয়ে গেছে। কালবৈশাখীর চোখ রাঙানির এ সময়েও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সেদিকে কোনো নজর নেই বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রী ও লঞ্চসংশ্লিষ্টরা।
সদরঘাট থেকে সাধারণ সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০টি লঞ্চ চলাচল করলেও ঈদযাত্রায় প্রায় ২০০ লঞ্চ চলাচল করছে। নৌপথের সুষ্ঠু যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে বিআইডব্লিউটিএ বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছে। সেসব নির্দেশনার মধ্যে টিকিট কেনার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র দেখানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ঈদের পাঁচদিন আগে থেকে লঞ্চে মোটরসাইকেল পরিবহন করা যাবে না। ঈদের পরের পাঁচদিন পর্যন্ত এ নির্দেশনা বলবৎ থাকবে। এ সময় নদীতে কোনো বালিবাহী ট্রলার চলাচল করতে পারবে না। তাছাড়া অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
কাগজে-কলমে এসব নির্দেশনা দেয়া হলেও এর অনেক কিছুই মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ যাত্রীদের। গতকাল সরেজমিন সদরঘাট টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, নৌপথের যাত্রীরা প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে আগেভাগেই ছুটছেন আপন ঠিকানায়। কিন্তু চলতি মৌসুমে বৈশাখী ঝড় মাথায় নিয়ে লঞ্চযাত্রার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে যাত্রী ও লঞ্চসংশ্লিষ্টদের।
পরিবারকে লঞ্চে তুলে দিয়ে চাঁদপুরের মোশাররফ হোসেন বলেন, এ বছর বৈশাখী ঝড় মাথায় নিয়ে শুরু হয়েছে আমাদের ঈদে ঘরে ফেরা। স্বাভাবিকভাবেই বিআইডব্লিউটিএ, লঞ্চ মালিক, চালক, কর্মচারী, যাত্রী সবার সতর্ক হতে হবে যেন অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই না হয়।
বাড়তি সতর্কতা না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে লঞ্চ মাস্টার এবং ইঞ্জিন ড্রাইভারদের বক্তব্যেও। ঢাকা-বেতুয়া রুটের এমভি তাসরিফ-৪ লঞ্চের মাস্টার আবু সাঈদ বণিক বার্তাকে বলেন, কালবৈশাখী সবসময়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। ঝড়ের কবলে পড়লে লঞ্চ চালানোর যে নির্দেশনা রয়েছে তা মেনে চললে দুর্ঘটনার শঙ্কা কম থাকে। ঈদে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই হয়, তাই এবার ঝুঁকি বেশিই বলতে হবে।
মনপুরা ও হাতিয়া রুটের এমভি ফারহানা-৪ লঞ্চের মাস্টার এনামুল হক বলেন, বিআইডব্লিউটিএর লোকজন মাঝে মাঝে এসে খোঁজখবর নিয়ে যায়। ঈদে লঞ্চের সংখ্যা বেড়েছে। এখন তদারকি আরো কম হচ্ছে। ফলে অনেক ফিটনেসবিহীন লঞ্চও চলাচল করছে। আবার অনেক অদক্ষ মাস্টারও লঞ্চ চালাচ্ছেন। ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চগুলো যখন নদীতে নামবে এবং বিপদের সম্মুখীন হবে, তখন দুর্ঘটনার শঙ্কা বেড়ে যাবে।
পাতারহাট রুটের শরীয়তপুর-৩ লঞ্চের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. আনোয়ার বলেন, ঈদের সময় বাল্কহেডগুলো নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তাদের জন্য লঞ্চ চালাতে বেশ সমস্যা হয়। তাছাড়া অনেক জায়গায়ই নাব্যতা সংকট রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর উচিত ছিল রোজার আগেই নাব্যতা সংকট দূর করে ঈদযাত্রা সুষ্ঠু করা।
প্রতিটি লঞ্চে প্রবেশের পথেই একটি তালিকা রয়েছে। তালিকায় যাত্রীর ধারণক্ষমতাসহ লঞ্চে থাকা নিরাপত্তাসামগ্রীর পরিমাণ উল্লেখ করা আছে। কিন্তু যে পরিমাণ বয়া, লাইফ জ্যাকেট ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের কথা তালিকায় বলা আছে, তা লঞ্চ ও যাত্রীর তুলনায় নিতান্তই কম। আবার কোনো কোনো লঞ্চে নিরাপত্তাসামগ্রীর যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে বাস্তবে তা নেই।
নিরাপত্তাসামগ্রী রাখা না-রাখা এখন তামাশায় পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে বিআইডব্লিউটিএর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিষয়টি যেন তালিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ নৌযান আইনে পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপত্তাসামগ্রী রাখা বাধ্যতামূলক। বিআইডব্লিউটিএ এক্ষেত্রে নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর লঞ্চগুলোয় পর্যাপ্ত পরিমাণ অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রাখা ও নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হওয়ার নির্দেশনা জারি করে সরকার। কিন্তু বেশির ভাগ লঞ্চের ইঞ্জিন রুমের বাইরে আর কোথাও অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা খুঁজে পাওয়া যায় না।
সার্বিক বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতিবারের মতো এবারো আমরা বিশেষ নির্দেশনা ও তদারকি অব্যাহত রেখেছি। কোথাও অনিয়ম দেখলেই মামলা করছি। তবে সুষ্ঠু ঈদযাত্রার জন্য যাত্রীদেরও সহযোগিতা করতে হবে। নয়তো এত বিশালসংখ্যক যাত্রীকে সেবা দেয়া দুরূহ হয়ে পড়বে।










