দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে দেশের পুঁজিবাজারের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন মো. রকিবুর রহমান। সুদীর্ঘ এ সময়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি আলোচিত-সমালোচিত হয়েছেন। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের পুঁজিবাজারের কেলেঙ্কারির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে তার নাম। এ কারণে তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সব মিলিয়ে দেশের পুঁজিবাজারে সবসময়ই আলোচনার শীর্ষে ছিলেন রকিবুর রহমান। ১৮ মার্চ রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে মারা যান তিনি। কয়েক মাস ধরে অনেকটাই পাদপ্রদীপের বাইরে ছিলেন তিনি। এক প্রকার নীরব প্রস্থানই হয়েছে আলোচিত এ ব্রোকারের।

স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে ১৯৭৬ সালে পুঁজিবাজারের নতুন করে যাত্রার সময়েই লাইসেন্সপ্রাপ্ত হন মো. রকিবুর রহমান। তিনি ১৯৯১-৯৭ সাল পর্যন্ত ডিএসইর কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭-২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি এক্সচেঞ্জটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ২০০৭-০৯ পর্যন্ত পরিচালক, ২০০৯-১০ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট, ২০১০-১২ পর্যন্ত পরিচালক, ২০১২-১৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ডিমিউচুয়ালাইজেশন (ব্যবস্থাপনা থেকে মালিকানা পৃথক্করণ) পরবর্তী সময়ে ২০১৬-২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই মেয়াদে টানা ছয় বছর ডিএসইর শেয়ারহোল্ডার পরিচালক ছিলেন রকিবুর রহমান। তিনি করপোরেট সিকিউরিটিজ ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান, ব্যাংকার্স অ্যাপারেলস ও বাংলাদেশ ইনডেন্টিং এজেন্সির সহযোগী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি চিটাগং সিমেন্ট ক্লিংকার (বর্তমানে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট), ন্যাশনাল টিউবস লিমিটেড ও ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালকের দায়িত্বেও ছিলেন।

দেশের পুঁজিবাজারে প্রথম ধস নামে ১৯৯৬ সালে। ধস-পরবর্তী সময়ে এর কারণ অনুসন্ধানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। তিন মাস পর ১৯৯৭ সালের ২৭ মার্চ তদন্ত কমিটি সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এ প্রতিবেদনে শেয়ার কারসাজিতে রকিবুর রহমানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে চিটাগং সিমেন্টের শেয়ার কারসাজির বিষয়টি উঠে আসে। আর এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯৯৭ সালের ৪ মে মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে মামলা করে বিএসইসি। মামলায় রকিবুর রহমানের সঙ্গে টি কে গ্রুপের মালিক আবু তৈয়ব ও বুলবুল সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএসএম শহিদুল হক বুলবুলকেও আসামি করা হয়। মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, আসামিরা ১৯৯৬ সালে চিটাগং সিমেন্টের পরিচালক ছিলেন। ভারতীয় ও ইরানি বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির শেয়ার কিনবে বলে আসামিরা মূল্যসংবেদনশীল তথ্য ছড়িয়ে শেয়ারমূল্য প্রভাবিত করেন। এ ব্যাপারে পরবর্তীকালে চিটাগং সিমেন্টের পক্ষে সন্তোষজনক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এছাড়া বিএসইসির নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও রকিবুর রহমান ও এএসএম শহিদুল হক বুলবুল কোম্পানিটির পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেননি, যা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স-১৯৬৯-এর ১৭ ধারা অনুসারে কারসাজি বলে মনে করে গঠিত তদন্ত কমিটি। অবশ্য শেয়ার কেলেঙ্কারির এ মামলায় ২০১৮ সালে পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনালের রায়ে রকিবুর রহমানসহ তিন আসামিক বেকসুর খালাস ঘোষণা করা হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে বিএসইসির পক্ষ থেকে আপিল করা হয়েছে, যা বর্তমানে বিচারাধীন।

২০১০ সালের পুঁজিবাজার ধসের সঙ্গেও রকিবুর রহমানের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে আসে। শেয়ারবাজার ধসের কারণ উদ্ঘাটনে গঠিত খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদের তদন্ত প্রতিবেদনে রকিবুর রহমানের সন্দেহজনক ভূমিকার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে তদন্ত কমিটির আলোচনায় তত্কালীন ডিএসইর সভাপতি রকিবুর রহমান গ্রামীণফোনের আইপিও প্রস্তাব আটকে দিয়ে সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে গ্রামীণফোনের প্লেসমেন্ট শেয়ার পেয়ে তিনি কোম্পানিটিকে তালিকাভুক্ত করাতে রাজি হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ সালের ১ মার্চ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। বিদ্যমান কোম্পানিগুলোর শেয়ারের অভিহিত মূল্য অপরিবর্তিত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর গ্রামীণফোনের আইপিওকে অনাবশ্যকভাবে আটকে রেখে অযৌক্তিকভাবে প্রতি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা করা হয় ২০১০ সালের ১০ মে। প্রজ্ঞাপনের ভাষা বাধ্যতামূলক না হলেও ডিএসইর পক্ষ থেকে সে সময় জানানো হয় যে ১০ টাকা অভিহিত মূল্য ছাড়া কোনো শেয়ার তারা তালিকাভুক্ত করবে না। এ সিদ্ধান্তের পেছনে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনার চেয়ে বেশি কাজ করেছে একশ্রেণীর প্রভাবশালী ডিএসই সদস্য ও পুঁজিবাজারের খেলোয়াড়দের স্বার্থ ও চাপ। এদের মধ্যে প্রধান ছিলেন ডিএসইর তত্কালীন সভাপতি রকিবুর রহমান। তার বিরুদ্ধে প্লেসমেন্ট শেয়ার বাণিজ্যের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলারও অভিযোগ রয়েছে।

খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদের তদন্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ডিএসইর সাবেক সভাপতি মো. রকিবুর রহমান সবসময়ই ডিএসই ও এসইসিকে প্রভাবিত এমনকি নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত করেছেন। তার চাপে এসইসি অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে আবার অনেক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। রকিবুর রহমানের ভাগ্নে আরিফুর রহমান ব্যক্তি পর্যায়েও পুঁজিবাজারের উত্থান-পতনের সময়ে শীর্ষ সক্রিয় ব্যক্তি ছিলেন বলে কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে মো. রকিবুর রহমানের বিষয়ে আরো বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজার ধসের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনে তিনি সন্দেহের তালিকায় ছিলেন। ২০১০ সালের তদন্ত প্রতিবেদনেও তার ভূমিকা নিয়ে অনেক মতামত ও কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছে। সে সময় এসইসির চেয়ারম্যান নিয়োগ ও সদস্য হিসেবে মনসুর আলমের পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রেও তার তদবির ও সমর্থন ছিল বলে অনেকের বিশ্বাস। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাজারে লেনদেন ও পরিচালনায় রকিবুর রহমানের প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন বলে মনে করে তদন্ত কমিটি।

পুঁজিবাজার কারসাজি ছাড়াও ডিএসইর দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে রকিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে এক্সচেঞ্জটির একজন সদস্য বণিক বার্তাকে বলেন, পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তিনি সামনের সারিতে থাকতেন এটা সত্য। কিন্তু এর আড়ালে এক্সচেঞ্জের কার্যক্রমে তিনি অনৈতিক হস্তক্ষেপ করেছেন। বিভিন্ন কেনাকাটায় তিনি প্রভাব খাটিয়েছেন। জনবল নিয়োগেও তার প্রভাব ছিল। তার প্রভাব এত বেশি ছিল যে কেউই এসব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কথা বলত না। আর যারা প্রতিবাদের চেষ্টা করতেন তাদের তিনি বিভিন্নভাবে শায়েস্তা করতেন।

সম্প্রতি ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা (সিআরও) হিসেবে তার ছেলের বন্ধু এম আশিক রহমানকে নিয়োগ দেয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন রকিবুর রহমান। তিনি নমিনেশন অ্যান্ড রিমিউনারেশন কমিটি (এনআরসি) ও পর্ষদের সদস্য হিসেবে এমডি পদে এম আশিক রহমানের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন। তার প্রভাবের কারণে আশিক রহমানের চেয়ে যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও তাকেই এমডি হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল এক্সচেঞ্জটির পর্ষদ। যদিও এ নিয়োগের বিষয়টি সে সময় অনুমোদন করেনি বিএসইসি। বরং এম আশিক রহমানের যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ডিএসইর বোর্ড অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেগুলেশন ২০১৩-এ নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হওয়া সত্ত্বেও তাকে সুপারিশ করার কারণে কমিশনের পক্ষ থেকে খেদোক্তি প্রকাশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে এম আশিক রহমানকে এক্সচেঞ্জটির সিআরও পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা রাখেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য এম আশিক রহমান সিআরও পদে যোগদান করেননি। এর আগে এক্সচেঞ্জটির সাবেক এমডি কাজী সানাউল হকের নিয়োগের সময়ও রকিবুর রহমান প্রভাব খাটিয়েছিলেন। সে সময় এক্সচেঞ্জটির বেশ কয়েকজন পরিচালক তার এ ভূমিকার বিরোধিতা করেছিলেন। সর্বশেষ গত বছর ডিএসইর নতুন ট্রেক লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রেও রকিবুর রহমান প্রভাব খাটিয়েছিলেন।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে গত বছরের নভেম্বর থেকেই অনেকটা পাদপ্রদীপের আড়ালে ছিলেন রকিবুর রহমান। গত বছরের ডিসেম্বরে চিকিৎসার জন্য তিনি থাইল্যান্ডে গিয়েছিলেন। সম্প্রতি তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সেখানকার বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যেই ১৪ মার্চ তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে দেশে এনে ইউনাইটেড হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ মার্চ তিনি মারা যান। বেশ কয়েক বছর ধরেই প্রোস্টেট ক্যান্সারে ভুগছিলেন ডিএসইর এ প্রবীণ সদস্য। সিঙ্গাপুরে কয়েক দফা চিকিৎসায় তিনি অনেকটা সুস্থ হন। মাঝে তিনি দুবার নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে থাইল্যান্ডে যাওয়ার আগে তিনি রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

শারীরিক অসুস্থতার কারণেই পুঁজিবাজারের আলোচিত ব্রোকার রকিবুর রহমানের নীরব প্রস্থান হয়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট মো. ছায়েদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, তার মৃত্যুতে পুঁজিবাজার একজন অভিজ্ঞ অভিভাবক হারিয়েছে। তার শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। শারীরিক অসুস্থতার কারণে শেষের দিকে তিনি পুঁজিবাজার থেকে দূরে ছিলেন।