দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ভারী যানচালক সংকটে ভুগছে। অদক্ষ চালক এমনকি পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের দিয়ে ভারী যান চালানোর মতো ঘটনাও ঘটছে দুই সিটিতে। গত বছরের নভেম্বরে দুই সিটির বর্জ্যবাহী গাড়ির চাপায় পরপর দুজনের মৃত্যু হলে ভারী যানচালক নিয়োগের বিষয়ে উদ্যোগী হন সংশ্লিষ্টরা। নতুন ৫১ জন চালক নিয়োগের পরও দুই সিটিতে ভারী যানচালক সংকট রয়েছে ১৫৪ জন। মূলত নির্দিষ্ট বয়সসীমার কারণে ভারী যানচালক নিয়োগে জটিলতা দেখা দিয়েছে। সমস্যা সমাধানে বয়সের শর্ত শিথিলের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমানে দুই সিটির নিবন্ধিত মোট গাড়ির সংখ্যা ৯৪২। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) গাড়ি ৬০৯টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৩৩টি। এসব গাড়ি চালানোর জন্য বৈধ লাইসেন্সধারী চালক আছেন ২১০ জন। এর মধ্যে ডিএসসিসির ১৩৭ এবং ডিএনসিসির ৭৩ জন। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুই সিটির ভারী যানের সংখ্যা ৩৩০। এর মধ্যে ডিএসসিসির ১৮৩টি এবং ডিএনসিসির আছে ১৪৭টি। গাড়িগুলো চালানোর জন্য বৈধ লাইসেন্সধারী চালক রয়েছেন ১৭৬ জন। ডিএসসিসির ১৩৭ জন এবং ডিএনসিসির ৩৯ জন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে নিয়োগের পরও দুই সিটির ভারী যানচালক সংকট রয়েছে ১৫৪। সম্প্রতি ডিএসসিসি ৫১ জন ভারী যানচালক নিয়োগ দিয়েছে। এ সত্ত্বেও সংস্থাটিতে আরো ৪৬ জন ভারী যানচালক প্রয়োজন। অন্যদিকে ডিএনসিসি ৪৭ জন ভারী যানচালক নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে এবং সেটি পাসও হয়েছে। এ-সংখ্যক চালক নিয়োগ দেয়ার পরও সংস্থাটির ভারী যানচালক সংকট দাঁড়াবে ৬১ জনে।

এদিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও চাহিদামতো ভারী যানচালক পাচ্ছে না সংস্থা দুটি। মূলত নির্দিষ্ট বয়সসীমার কারণেই প্রয়োজনীয়সংখ্যক ভারী যানচালক পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটির আশু সমাধান না হলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে দুই সিটিতেই। ভোগান্তি বাড়বে নগরবাসীর। দুই সিটির পরিবহন শাখা সূত্রে জানা গেছে, প্রয়োজনের চেয়ে কম চালক নিয়োগ দেয়ায় দুই সিটির চালক সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এদিকে নির্দিষ্ট বয়সসীমার কারণে বিজ্ঞপ্তি দিয়েও চাহিদামতো চালক পাওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং পরীক্ষার পর চালককে প্রথমে হালকা মোটরযানের (ওজন ২৫০০ কেজির নিচে) পেশাদার লাইসেন্স দেয়া হয়। তিন বছর হালকা মোটরযান চালানোর পর একজন চালক মধ্যম শ্রেণীর মোটরযান (২৫০০ থেকে ৬৫০০ কেজি) চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠেন। একইভাবে তিন বছর মধ্যম শ্রেণীর মোটরযান চালানোর পর চালককে ভারী মোটরযান (৬৫০০ কেজির ওপরে) চালানোর জন্য পেশাদার লাইসেন্স দেয়া হয়। এ হিসেবে একজন চালক ২১ বছর বয়সে হালকা যানের লাইসেন্সের আবেদন করার পর ভারী যানের লাইসেন্স পেতে তার অন্তত ২৭ বছর বয়স হয়ে যায়। কিন্তু দুই সিটি করপোরেশনের পরিবহন শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, যেহেতু আমাদের দেশের চালকরা সচেতন না এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৩০ বছরের মধ্যেই আবেদন করতে হয়, ফলে সিটি করপোরেশনের ভারী যানচালক নিয়োগে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। তবে এ শর্ত সাময়িক শিথিল করা হলে অর্থাৎ নিয়োগপ্রাপ্ত হালকা মোটরযানের লাইসেন্সধারী চালকরা তিন বছরের কম অভিজ্ঞতা নিয়েই ভারী মোটরযানের লাইসেন্স পাওয়ার বিশেষ অনুমতি বিআরটিএ থেকে দেয়া হলে ভারী যানচালক সংকট সহজেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করেন তারা।

শুধু যে দুই সিটি করপোরেশনই প্রয়োজনীয় চালক পাচ্ছে না, বিষয়টি এমন নয়। মাঝারি ও ভারী মোটরযানের চালক সংকট সারা দেশেই রয়েছে। বিআরটিএর হিসাব বলছে, সারা দেশে নিবন্ধিত মোটরযান প্রায় ৪০ লাখ। এর বিপরীতে বিআরটিএ অনুমোদিত চালকের সংখ্যা মাত্র ২০ লাখ। দেশে মধ্যম ও ভারী দুই শ্রেণীর মোটরযান চালক সংকটের কথা জানিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বিআরটিএর কর্মকর্তারা। বিষয়টি সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে বিআরটিএর একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, সারা দেশেই মাঝারি ও ভারী মোটরযানের চালক সংকট রয়েছে। এ সংকট কাটাতে সাময়িকভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্তির শর্ত শিথিল করার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে কাগজপত্র জমা দেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন দেয়া হলে সাময়িকভাবে তিন বছরের বদলে মাত্র এক বছরের অভিজ্ঞতা দিয়েই মধ্যম শ্রেণীর মোটরযানের লাইসেন্স পাওয়া যাবে। একইভাবে তিন বছরের পরিবর্তে এক বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই মধ্যম শ্রেণীর মোটরযান চালকরা পাবেন ভারী মোটরযান চালানোর লাইসেন্স।

সূত্রমতে, চালক ঘাটতি মেটাতে ২০২০ সালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে ১০৭ জন চালক নিয়োগের চিঠি দেয় ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। চিঠির জবাবে ৫০ জন চালক নিয়োগের অনুমিত পায় সংস্থাটি। গত বছরের ২৯ জানুয়ারি ৫০ জন চালক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ১৯ জন চালক নিয়োগ দিতে পেরেছে তারা। এরপর গত ৮ ডিসেম্বর ডিএসসিসি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আরো ৩২ জন চালক নিয়োগ দেয়।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা দুবারে ৫১ জন ভারী যানচালক নিয়োগ দিয়েছি। আমরা আরো কিছুসংখ্যক চালক নিয়োগ দেব। বয়সসীমার কারণে ভারী যানচালক পাওয়া আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যতজন পাচ্ছি নিয়ে নিচ্ছি। বাকিদের আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, ভারী যানচালক নিয়োগের কার্যক্রম আমাদের শুরু হয়েছে। আমরা ৪৭ জন চালক নিয়োগ দেব। এর পরও কিছু ঘাটতি থাকবে। তবে আগের মতো আর বিড়ম্বনা পোহাতে হবে না আমাদের।