ডেঙ্গুর প্রকোপে বাড়ছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা। এডিস মশাবাহিত এ ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেশে নতুন করে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরে একদিনে সর্বোচ্চ। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৭১ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০-জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনে সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টার এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের ২৭ দিনেই ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৫৫ জন। এর আগে সেপ্টেম্বরে ১৪৮, আগস্টে ৪৩, জুলাইয়ে ৩৬, জুনে ১৩ ও মে মাসে একজনের মৃত্যু হয়। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে মারা যান দুজন করে।

পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তির ১৮-৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুবরণ করছেন। সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আসা, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি এ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীদের অবস্থা খুব সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে অনেক ক্ষেত্রে তাদের বাঁচানো যাচ্ছে না। আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মারা যাওয়া রোগীদের অনেকে হাসপাতালে ভর্তির ১৮-৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুবরণ করছেন।’

রোগীদের চিকিৎসায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীও পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে দেশের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা সীমিত। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমাতে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত নতুন করে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিভাগে, ৮৯৯ জন। এছাড়া খুলনায় ২৫০, চট্টগ্রামে ২৪১, রাজশাহীতে ২২৯, বরিশালে ২১৭, রংপুরে ১১২, ময়মনসিংহে ৯৭ ও সিলেটে ২৬ জন ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১১ জনের মধ্যে ছয়জন খুলনা বিভাগের, তিনজন ঢাকার এবং চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগের একজন করে।

চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ২৩৭ রোগী। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ লাখ ২১ হাজার ৪২২ জন। বর্তমানে ৬ হাজার ৪১৫ রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর পেছনে ভাইরাসের ধরন বা ভেরিয়েন্ট পরিবর্তনের চেয়ে কয়েকটি বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে রয়েছে সময়মতো চিকিৎসা না নেয়া, রোগীর অবহেলা এবং এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের মতো বিষয়গুলো। জ্বর কমে গেলে অনেক রোগী মনে করে, তারা সুস্থ হয়ে গেছে। অথচ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম দিন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ ও প্লাজমা লিকেজের কারণে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের সময়ও রোগীর ঝুঁকি বাড়ে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এর অন্যতম কারণ এডিস মশার প্রজননস্থল লক্ষ্য করে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারা। একই সঙ্গে মশা নিয়ন্ত্রণে জনগণকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করাও সম্ভব হয়নি। তাই ডেঙ্গু মোকাবেলায় শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’