এসব সাফল্যকে ‘অবিস্মরণীয় অর্জন’ হিসেবে অভিহিত করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। গতকাল বিকালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অর্জন তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার তাদের দায়িত্ব পালনের দুই মাস পূর্ণ করেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর গণতন্ত্রের পুনরুত্থান এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ একই সঙ্গে ‘টাইম’ সাময়িকীতে বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় এ বছর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্থান পাওয়াকে তার দূরদর্শী নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করেন এ উপদেষ্টা।
মাহদী আমিন জানান, সরকার একটি স্বচ্ছ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কর্মপরিকল্পনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা জনগণের সামনে তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা নিজ নিজ দপ্তরের কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত বক্তব্য দেবেন।
নির্বাচনী ইশতাহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘প্রতিটি নাগরিকের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেয়ার পাইলট প্রকল্পে ৩৭ হাজার ৫৬৭ পরিবারকে মাসিক আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেয়া হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম ছালেহ ছবি: পিএমও
কৃষি খাতে অগ্রগতির বিষয়ে তিনি জানান, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষক ও কৃষাণীদের জন্য ১০টি সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে ১০ জেলার ২২ হাজার কৃষককে এর আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোর ধারাবাহিকতা রক্ষায় অল্প সময়ের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলেও জানান মাহদী আমিন। এছাড়া মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ অধিকতর যাচাই-বাছাই শেষে সংসদে বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, পুরোহিত, অধ্যক্ষ ও যাজকদের জন্য সম্মানী প্রদানের কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং হজযাত্রার টিকিটপ্রতি খরচ ১২ হাজার টাকা কমানো হয়েছে। সরকারি শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।’
মাহদী আমিন জানান, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও কূটনৈতিক তৎপরতায় দেশে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে নতুন ৩৫ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ। শিক্ষা ক্ষেত্রে ভর্তি ফি বাতিল ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ব্যাংক গ্যারান্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা হয়েছে।
খেলাধুলা ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রতি উপজেলায় ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং নদী দখল ও দূষণ রোধে নেয়া হয়েছে আইন সংশোধনের উদ্যোগ।’
অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ‘বিদেশী বিনিয়োগ সহজ করতে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে সম্পদ শনাক্তকরণ ও আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’ এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনা, প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো এবং এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালুর মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
সরকারের স্বচ্ছতা ও মিতব্যয়িতার উদাহরণ হিসেবে মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ভবন যমুনা ব্যবহার না করে নিজের বাসভবনে অবস্থান করছেন এবং ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করেছেন। এছাড়া মন্ত্রীরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
এছাড়া ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খননের উদ্যোগ; জ্বালানি সংগ্রহের জন্য ‘ফুয়েল কার্ড’-এর পাইলটিং চালু; রমজান ও পরবর্তী সময়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ; জাকাত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন; ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ; বন্ধ চিনিকল, রেশম ও পাটকল পুনরায় চালুর উদ্যোগ; মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা; আট দেশের সঙ্গে নতুন শ্রমবাজারের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি; উত্তরবঙ্গকে ‘এগ্রো প্রসেসিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা; স্বাস্থ্যসেবায় ‘ই-হেলথ কার্ড’; পুনঃভর্তি ফি বাতিল; ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ পাইলট প্রকল্প এবং ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ গ্রহণসহ অন্যান্য পদক্ষেপও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
সব শেষে মুখপাত্র মাহদী আমিন আশা প্রকাশ করেন, বিরোধী দল গুজব ও হট্টগোলের পথ পরিহার করে দেশের উন্নয়নে গঠনমূলক সহযোগিতা প্রদান করবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম ছালেহ, প্রধানমন্ত্রীর স্ক্রিপ্ট রাইটার মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি, হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা সুজনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের সদস্যরা।










