আলু চাষের জন্য বেশ উপযোগী কুড়িগ্রাম জেলার মাটি। অধিক লাভের আশায় প্রতি মৌসুমেই জেলার কৃষক বিভিন্ন জাতের আলু আবাদ করেন। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে আগের তুলনায় উৎপাদনও বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ২১ হাজার টন আলু বেশি উৎপাদন করেছে কৃষক। তবে সে তুলনায় মিলছে না দাম। উৎপাদনসহ হিমাগারের ভাড়া মিলিয়ে প্রতি কেজিতে খরচ হয়েছে ২৮ টাকা। অথচ পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১০-১২ টাকা। উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম অর্ধেকের কম হলেও মিলছে না ক্রেতা। বারবার নোটিস পাওয়ার পরও হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন করছেন না মজুদকারী কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। মজুদ করা আলু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হিমাগার মালিকরাও।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, গত বছর কুড়িগ্রামে ৭ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছিল। উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার টন। এ বছর ৭ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ৮ হাজার হেক্টরে। উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার টন। গত বছরের চেয়ে এ বছর ৯০০ হেক্টর বেশি জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। বাড়তি উৎপাদন হয়েছে ২১ হাজার টন।

কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আলু ৮০-১০০ টাকা বিক্রি হওয়ায় এ বছর বেশি পরিমাণ জমিতে আবাদ করেছেন কৃষক। বেশি লাভের আশায় ঋণ করে বেশি পরিমাণ জমিতে আলু আবাদ করে হিমাগারে মজুদ করেন তারা। উৎপাদনসহ হিমাগারের ভাড়া মিলিয়ে প্রতি কেজিতে ২৮ টাকা খরচ হয়েছে। তবে বর্তমানে প্রতি কেজি আলু পাইকারি বাজারে ১০-১২ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তাতেও মিলছে না ক্রেতা। এ অবস্থায় টিসিবির পণ্যে আলু সংযুক্তসহ বিদেশে রফতানি বাড়িয়ে দাম সমন্বয়ের দাবি তাদের।

অবশ্য আগামী বছর আলু উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতামতের ভিত্তিতে দাম সমন্বয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।

রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের কৃষক মিজানুর রহমান জানান, কোনো বছর আলু আবাদ করে এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি। এবার দাম এতটা কম হবে তা কেউ ভাবতে পারিনি। হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি করলে প্রতি কেজির দাম পাওয়া যাচ্ছে ১১ টাকা। সেখান থেকে হিমাগারের ভাড়া মেটাতে হয় ৬ টাকা। আর মজুদকারীদের থাকছে মাত্র ৫ টাকা। যেখানে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ২২-২৪ টাকা। তাহলে এ ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেয়া সম্ভব। যেকোনো উপায়ে কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে না পারলে আগামীতে আলু আবাদ ছেড়ে দেবে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার আলু ব্যবসায়ী সোলায়মান আলী বলেন, ‘টিসিবির পণ্যসহ সরকারিভাবে যেসব খাদ্য সরবরাহ করা হয়, সেখানে আলু অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকারের এটা করা উচিত। না হলে আগামীতে আলু আবাদ কমে গেলে আবারো দাম অনেক বেড়ে যাবে। বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য অবশ্যই জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’

সরজমিনে দেখা গেছে, জেলার চারটি হিমাগারে ৫২ হাজার টন আলু মজুদ রয়েছে। এখন পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছে চার হাজার টন। বিগত বছরগুলোয় এ সময় হিমাগারগুলোর সামনে আলুর ক্রেতার ভিড় থাকলেও এ বছর মিলছে না। তবু প্রতিদিন হিমাগার থেকে আলু বের করে বাছাইয়ের পর ক্রেতার অপেক্ষায় থাকেন মজুদকারী কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।

হিমাগার মালিকরা বলছেন, দাম কম হওয়ায় বারবার নোটিস দেয়ার পরও আলু উত্তোলন করছেন না কৃষক। তবে মজুদকারীরা বলছেন, কম দাম হলেও ক্রেতা না থাকায় আলু উত্তোলন করছেন না তারা।

এ হক হিমাগার লিমিটেডের ম্যানেজার মাজেদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দাম না থাকায় বারবার চিঠি দেয়ার পরও আলু উত্তোলন করছেন না কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। যদি শেষ পর্যন্ত দাম না বাড়ে তাহলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগারের মালিক সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে।’

কুড়িগ্রাম কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা রিমা মনি শীল বলেন, ‘আগামীতে আলু আবাদে নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর আলুচাষী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করছে। কিছু প্রস্তাবনা সরকারকে জানানো হয়েছে। কীভাবে আলুচাষীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া যায়, সে লক্ষ্যে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কাজ শুরু করেছে।’