দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কিছু কিছু স্থানে আন্দোলনরতদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদেরও সংঘর্ষ হয়েছে। কয়েকটি স্থানে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদেরও সংঘর্ষ হয়েছে। অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে পুলিশ বক্স ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) গাড়িতে। ভাংচুর করা হয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কার্যালয়ে। গতকাল বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও কুষ্টিয়ায় এসব ঘটনা ঘটে।
বরিশাল প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের হাতেম আলী কলেজ চৌমাথায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল বিকাল ৩টায় বিএনপি নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ শুরু করলে হামলা চালায় বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। হামলায় উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন সাদেক আব্দুল্লাহও। সংঘর্ষের পর ওই এলাকাটি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
এছাড়া বেলা ৩টার দিকে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কে বিক্ষোভ করেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচি চলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত। এ সময় সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।
নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে জালকুড়ি পর্যন্ত পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। দুপুরের দিকে তারা সাইনবোর্ড এলাকায় জড়ো হয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। সাইনবোর্ড থেকে জালকুড়ি এলাকায় ২০টি পয়েন্টে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে। রোড ডিভাইডারের ব্লক, গাছের গুঁড়ি ও বিদ্যুতের খুঁটি দিয়ে সড়ক অবরোধ করে রাখে। তবে দুপুরের দিকে হওয়া ওই বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। বেলা ২টার দিকে জেলা পুলিশ মাইকিং করে তাদের সরে যেতে বলে। পরে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশও রাবার বুলেট, ছররা গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এসব ঘটনায় পুলিশ ও সাংবাদিকসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এর আগে সাইনবোর্ড এলাকায় বিক্ষুব্ধদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আন্দোলকারীদের ওপর হামলার চেষ্টা করলে তারা সাইনবোর্ড এলাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক ব্যাপারীর একটি বহুতল ভবনে অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় ওই আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ির আশপাশের কয়েকটি বাড়িতেও ভাংচুর করা হয়। বিকালে জালকুড়ি জেলা যুব উন্নয়ন অফিস এলাকায় অবস্থান নিতে দেখা গেছে পুলিশকে। পরে পুলিশ ওই এলাকা ত্যাগ করলে যুব উন্নয়ন অফিসে আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধরা।
এছাড়া আগুন দেয়া হয়েছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে অবস্থিত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার মালিকানাধীন পার্কেও। আগুন দেয়া হয়েছে জেলা যুব উন্নয়ন অফিসের পাশে এসবি গার্মেন্টসেও।
আগের দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে আন্দোলনকারীরা সাইনবোর্ড থেকে চলে যাওয়ার পর স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকজন সেখানে অবস্থান নেয়। পরে তারা স্থানীয় পাসপোর্ট অফিসে হামলা ও ভাংচুর করে। পাসপোর্ট অফিসের চারতলা ভবনের প্রতিটি কক্ষ ভাংচুর করা হয়। এ সময় পাসপোর্ট অফিসের সার্ভার রুমসহ প্রায় প্রতিটি কক্ষে আগুন লাগিয়ে দেয় তারা। লুট করা হয়েছে অফিসের এসি, সিসিটিভির ডিভিআর ও ফার্নিচারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র।
নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের অফিস সহকারী মোস্তফা কামাল জানান, রাতে যখন বিক্ষুব্ধরা পাসপোর্ট অফিসে হামলা চালায়, তখন সেখানকার নিরাপত্তারক্ষী আনসার সদস্য শফিকুল ইসলাম ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহযোগিতা চান। তবে পুলিশ সময়মতো সেখানে না পৌঁছানোয় হামলাকারীরা পুরো অফিসই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। এছাড়া বৃহস্পতিবার রাতে ভাংচুর করা হয়েছে পাসপোর্ট অফিসের কাছেই অবস্থিত পিবিআই অফিসেও। পাঁচটি গাড়িসহ পুড়িয়ে দেয়া হয় ক্রাইম সিনের কাজে ব্যবহৃত গাড়িও। হামলার সময় পিবিআইয়ের অস্ত্র লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলেও জানা যায়।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল গতকাল জানান, দুপুরে আন্দোলনকারীদের রাস্তা থেকে সরাতে মাইকিং করে পুলিশ। তবে তারা তাতে কান না দিয়ে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছোড়া হয়েছে। পুলিশ সেখান থেকে চলে গেলে তারা জালকুড়িতে অবস্থিত শিল্প পুলিশের ক্যাম্পে হামলা চালায়। পরে ঘটনাস্থলের পাশেই থাকা বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের উদ্ধার করেন। এ সময় বিজিবি আন্দোলনকারীদের নিবৃত্ত করতে তাদের ওপর ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এসব সংঘর্ষে দুই পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
ঠাকুরগাঁও ও কুড়িগ্রামে বিএনপির পক্ষ থেকে মিছিল বের করার চেষ্টা করা হলেও তা পুলিশ হঠিয়ে দেয়। এছাড়া ময়মনসিংহে এসিল্যান্ডের গাড়িতে আগুন দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাইপাস চৌরাস্তা মোড়ে পুলিশ বক্স ও চরপাড়া মোড় পুলিশ বক্সেও আগুন দেয় তারা। এছাড়া নগরীর শিববাড়ী মোড়ে আওয়ামী লীগ অফিসে ভাংচুর ও নতুন বাজারে বিএনপি কার্যালয়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। সন্ধ্যার পর নগরীর মিন্টু কলেজ লেবেলক্রসিংয়ের সামনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নগরীর বিভিন্ন সড়কে পুলিশ টহল দিচ্ছে।
কুষ্টিয়ায় আজম আলী নামে এক পথচারী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ওষুধ আনতে গিয়ে শহরের চৌহাস মোড়ে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান তিনি। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে তার চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।










