প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিনিয়োগ ও আমানত দক্ষতার সঙ্গে দেশে কাজে লাগানোর জন্য নয় বছর আগে কার্যক্রম শুরু করে এনআরবি ব্যাংক। তবে প্রথম থেকেই সে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত আর্থিক খাতের এ প্রতিষ্ঠান। কখনো শেয়ার কারসাজিতে জড়িয়ে গুনতে হয়েছে আর্থিক জরিমানা, আবার কখনো সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে নিয়ম ভেঙে। আছে অভ্যন্তরীণ কোন্দলও। কর্তৃত্ব ধরে রাখতে নিজস্ব বলয় তৈরি নিয়ে ব্যস্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি অংশ। ব্যাংকিং কার্যক্রমে তাই সমন্বয় নেই। সব মিলিয়ে মহাসংকটে চতুর্থ প্রজন্মের অন্যতম এ তফসিলি ব্যাংক।
জানা গিয়েছে, এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মামুন মাহমুদ শাহসহ বিনিয়োগ কমিটির সদস্যদের কোণঠাসা করতে ভুয়া প্রজ্ঞাপনে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। আর্থিক অনিয়মের তদন্তের কথা জানিয়ে জিম্মি করা হয়েছে শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও। দীর্ঘদিন চলে আসা অভ্যন্তরীণ এ কোন্দল শেষমেশ থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়েছে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল তারা একটি প্রজ্ঞাপন পান। মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের শৃঙ্খলা-২ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব আফরোজা আক্তার রিবা স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আর্থিক অনিয়মের তদন্ত চলাকালীন ব্যাংকের এমডি মামুন মাহমুদ শাহসহ বিনিয়োগ কমিটির সদস্যরা দেশ ছাড়তে পারবেন না। এমনকি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতারও অনুরোধ জানানো হয়েছে সেই চিঠিতে। প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিবের দপ্তর, পুলিশ সদর দপ্তরের প্রশাসন শাখা, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি প্রশাসন ও এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশন পুলিশের প্রশাসন শাখায়।
এদিকে প্রজ্ঞাপনের সুযোগ নিয়ে সব ধরনের দাপ্তরিক কাজ থেকে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ও বিনিয়োগ কমিটির সদস্যদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালায় একটি অংশ। তবে বিভিন্ন অসামঞ্জস্য ও ভুল ধরা পড়ায় প্রজ্ঞাপনের সত্যতা যাচাইয়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। জবাবে মন্ত্রণালয় জানায়, এ ধরনের কোনো প্রজ্ঞাপন ইস্যু করেনি তারা। এর পরই টনক নড়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের। স্বাক্ষর জাল করে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত ভুয়া প্রজ্ঞাপন তৈরির ঘটনায় গুলশান থানায় মামলা হয়েছে। ব্যাংকের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. হাসানুর রহমান বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকের পক্ষে মামলাটি করেন। এতে আসামি করা হয়েছে ব্যাংকের সাবেক প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ কামরুল হাসানকে, যিনি শেয়ার কারসাজির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নোটিসে দায়িত্ব থেকে অপসারিত।
মামলার এজাহারে বাদী হাসানুর রহমান দাবি করেন, মোহাম্মদ কামরুল হাসান ব্যাংকের দায়িত্বে থাকাকালীন এবং অপসারণের পর ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নানা হুমকি দিয়ে আসছেন। ব্যাংকের এমডিসহ বিনিয়োগ কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও প্রতারণামূলক অভিযোগ, এমনকি জালজালিয়াতির মাধ্যমে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞায় ভুয়া প্রজ্ঞাপন দিয়ে হয়রানি করেছেন।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, মোহাম্মদ কামরুল হাসান সিএফও হিসেবে ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি এরআরবি ব্যাংকে যোগ দেন। দায়িত্ব বুঝে নেয়ার পর পরই জুনিয়র কর্মীদের নিয়ে তিনি এক ধরনের গ্রুপিং শুরু করেন। এমডিসহ বিনিয়োগ কমিটির সদস্যদের অনেকটা পাশ কাটিয়েই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যাংকে যোগদানের আটদিনের মাথায় অর্থাৎ ১২ জানুয়ারি প্রতিটি ১৪৪ টাকা ৩০ পয়সা মূল্যে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের এক লাখ শেয়ার কেনেন। পরদিনই ওই শেয়ারের দাম কমতে শুরু করে এবং ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রতিটির দাম দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৮০ পয়সায়। কিন্তু সেদিন এনআরবি ব্যাংক কোনো শেয়ার কেনেনি। ২০ জানুয়ারি যখন শেয়ারের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে, তখন মোহাম্মদ কামরুল হাসান প্রতিটি ১৪৮ টাকা ৭৯ পয়সা মূল্যে আরো এক লাখ শেয়ার কেনেন। সব মিলিয়ে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির তত্কালীন সিএফও কামরুল হাসানের সিদ্ধান্তে গড়ে ১২০ টাকা ৭৫ পয়সা মূল্যে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের ৫ লাখ ৮৮ হাজার শেয়ার কেনা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মতামত ছাড়াই একইভাবে জিবিবি পাওয়ার কোম্পানি, এসকে ট্রিমসের মতো আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনেন তিনি।
শেয়ারবাজারে এরআরবি ব্যাংকের বিনিয়োগের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আইন লঙ্ঘন করে ব্যাংকটির তত্কালীন সিএফও কামরুল হাসান পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্সে তার বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের প্রায় ৫৮ শতাংশই বিনিয়োগ করেন। সব মিলিয়ে এনআরবি ব্যাংক ৪৫৪ কোটি টাকায় বীমা প্রতিষ্ঠানটির ২৭ লাখ ৩৬ হাজার শেয়ার কেনে। যদিও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত মানতে পরবর্তী সময়ে তারা ১৯ লাখ শেয়ার লোকসানে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আর ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ অনুসারে, শেয়ার প্রিমিয়াম ও সিঙ্গেল স্টকে রিটেইন্ড আর্নিংসের ক্ষেত্রে একটি ব্যাংক তার মোট মূলধনের ৫ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে না। পরে ওই বছরই ১৬ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিনিয়োগের সীমার বাইরে গিয়ে শেয়ার কিনে সিকিউরিটিজ আইন ভাঙার জন্য এনআরবি ব্যাংককে ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে। পাশাপাশি এ ঘটনা অনুসন্ধানে গঠিত কমিটিও শেয়ার কারসাজির কারণে এনআরবি ব্যাংকের তত্কালীন সিএফও মোহাম্মদ কামরুল হাসানসহ চার কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক বজলুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, এনআরবি ব্যাংকের এমডিসহ বিনিয়োগ কমিটির সদস্যদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে একটি ভুয়া প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাচাই করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় একটি মামলা করেছে। আসামি করা হয়েছে ব্যাংকটির সাবেক সিএফও মোহাম্মদ কামরুল হাসানকে। এখন কামরুল হাসানকে গ্রেফতার করা গেলেই জানা যাবে কীভাবে তিনি এ ভুয়া প্রজ্ঞাপন জারি করলেন। তবে তিনি পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
এ প্রতিবেদক অবশ্য মোহাম্মদ কামরুল হাসানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি তা রিসিভ করেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর কয়েক দফা চেষ্টা করলেও তার সেলফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে এনআরবি ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুন মাহমুদ শাহসহ বণিক বার্তাকে বলেন, ঘটনাটি বিচারাধীন। তাই বিচারকাজ শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।










